২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যেখানে ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন সরকার বেছে নেবেন দেশের ১২ কোটিরও বেশি ভোটার। তবে এবারের ভোট শুধু সংসদ সদস্য নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সংবিধান সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা দিতে একই দিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহাসিক জাতীয় গণভোট। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৯৯টি সংসদীয় আসনে বিরতিহীনভাবে চলবে এই ভোটগ্রহণ। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।
তফসিল ঘোষণা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পরে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠন করা হয় একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর ভোটার তালিকা হালনাগাদ, সীমানা নির্ধারণ ও প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন করে। এর পরই গত ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতির উদ্দেশে ভাষণে নির্বাচনের মহাপরিকল্পনা বা তফসিল ঘোষণা করেন।
তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ছিল ৫ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র বাছাই চলে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। ১৪ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ হলেও পরবর্তীতে জোটের প্রার্থীদের ছাড় দেয়ার জন্য বিভিন্ন দলের অনুরোধে কিছু প্রার্থীর প্রতীক ব্যালটে রাখছে না নির্বাচন কমিশন। তফসিল ঘোষণার পরপরই দেশজুড়ে নির্বাচনী আমেজ শুরু হয় এবং প্রশাসনকে সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের অধীন ন্যস্ত করা হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থী সংখ্যা
এবার মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, যার জন্য সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। নির্বাচনে ৫০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে এবং মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা ২৭৩ জন।
আসনভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা-১২ আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন প্রার্থী লড়াই করছেন, যেখানে পিরোজপুর-১ আসনে সর্বনিম্ন মাত্র ২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মাঠের প্রধান শক্তি হিসেবে বিএনপি ২৯১ জন প্রার্থী দিয়েছে এবং তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ১১ দলীয় জোট (জামায়াত-এনসিপি) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (২৫৮ জন প্রার্থী) শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আওয়ামী লীগকে ছাড়াই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের সময় সংঘটিত ‘গণহত্যা’ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীন দলটির যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকা এবং নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন স্থগিত করায় আইনিভাবেই তারা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে।
বিটিভিতে শীর্ষ নেতাদের ভাষণ
এবার সব দলের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে বিটিভি ও বেতারে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের জন্য নির্ধারিত সময় বরাদ্দ করা হয়। বিভিন্ন দলের প্রধানরা সরাসরি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেছেন।
প্রচার-প্রচারণা
নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি অনুযায়ী, ২০ দিনের দীর্ঘ প্রচারণা শেষে গত ১০ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সব ধরনের জনসভা, মিছিল ও শোডাউন বন্ধ হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিনগুলোতে দেশের রাজপথ ছিল মিছিলের নগরী। বড় দলগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা এবং উঠান বৈঠকের ওপর জোর দিয়েছে। এবারের প্রচারণায় কোনো রঙিন পোস্টার বা দেয়াল লিখনের অনুমতি না থাকায় দেশের প্রতিটি অলিগলি সাদা-কালো পোস্টারে ছেয়ে গেছে, যা শহরগুলোতে এক ভিন্নধর্মী আবহের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের টানতে প্রতিটি দল কর্মসংস্থান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে ব্যাপক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন প্রচারণার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে বেশ কয়েকজন প্রার্থীকে শোকজ ও জরিমানা করেছে, যা সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
ঐতিহাসিক পোস্টাল ব্যালট ও প্রবাসীদের ভোটাধিকার
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করে এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আগে এই সুবিধা শুধু সরকারি চাকরিজীবী ও কারাবন্দিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এবার ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত হয়েছেন; যার মধ্যে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪৬ জন প্রবাসী এবং অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে (আইসিপিভি) ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৮ জন ভোটার রয়েছেন। ইসির সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, আজ সকাল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৬৫ জন এবং ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৮৫ জন প্রবাসী ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ই-কেওয়াইসি ও ফেসিয়াল ভেরিফিকেশন পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে এই প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো এই ব্যালটগুলো এরইমধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে পৌঁছেছে, যা আগামীকাল মূল ভোট গণনার সময় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
জোড়া ব্যালট ও গণভোট
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো– সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট। প্রতিটি ভোটারকে কেন্দ্রে দুটি ব্যালট পেপার দেয়া হবে।
সাদা ব্যালট: সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য।
গোলাপি ব্যালট: জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে বা বিপক্ষে ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের জন্য।
ভোটগ্রহণ করবেন ৮ লাখ কর্মকর্তা
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এবার দেশজুড়ে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটগ্রহণের সার্বিক সমন্বয়ে জেলা ও নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব পালন করছেন ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং ৫৯৮ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা। মাঠপর্যায়ে সরাসরি ভোটগ্রহণের জন্য ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে নিয়োজিত থাকছেন ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিসাইডিং অফিসার। তাদের সহায়তায় ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং অফিসার।










