দেশব্যাপী ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে আজ। মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত শরণার্থী শিবিরগুলোতে এই উৎসব উদযাপন করেছেন রোহিঙ্গারা। তবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে শিশুদের আনন্দ চোখে পড়লেও, বড়রা কাটিয়েছেন বিষাদে। তারা আশা করছেন, আগামী ঈদ আরাকানে কাটাবেন।
আজ শনিবার সকাল ৮টার পর উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ঈদের নামাজ পড়েছেন রোহিঙ্গারা। রাখাইনে মিয়ানমার সেনাদের চালানো নির্যাতনের বিভীষিকা আর ক্যাম্পে অভাব অনটনে- এই উৎসবের রঙ তাদের কাছে অনেকটাই বিবর্ণ।
রোহিঙ্গারা বলছেন, নিজ দেশ মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে টানা ৯ বছর ধরে বাংলাদেশে আশ্রিত তারা। ঘনবসতিপূর্ণ ঝুপড়ি ঘরে বেদনার ঈদ পার করছেন। আনন্দ-উৎসবের এই দিনেও তাদের জীবনে নেই স্বস্তি। স্বজনহারানোর কষ্ট, অনিশ্চয়তা আর নিজ ভূমিতে সম্মানজনকভাবে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তারা দিন গুনছেন।
নামাজ শেষে শিশুদের মধ্যে কিছুটা আনন্দের ছাপ দেখা গেলেও বড়দের চোখে-মুখে ছিল গভীর বিষাদ। রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের স্মৃতি আর বর্তমান শরণার্থী জীবনের অভাব-অনটনে ঈদের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
আজ ঈদের দিন উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন শিবির ঘুরে দেখা যায়, নতুন জামা-কাপড় পরে সেজেগুজে শিশুরা ক্যাম্পের রাস্তায় হৈ-হুল্লোড় আর আনন্দে মেতে উঠেছে।
শিশুদের জন্য টেকনাফের লেদা-জাদিমুড়াসহ কয়েকটি জায়গায় নাগরদোলা, চড়কিসহ মিনি মেলা বসেছে। এর আয়োজক নুর কামাল বলেন, এই মেলা কমপক্ষে তিন দিন থাকবে। এখানে শিশুরা এসে খুব আনন্দ উপভোগ করছে।
ঈদের জামাতে মুসল্লিদের কান্না
এদিকে ঈদের জামাত শেষে অনেক ইমাম ও মুসল্লি কান্নায় ভেঙে পড়েন। মোনাজাতে তারা নির্যাতনের বিচার কামনা করেন এবং বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের জন্য মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন।
কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, ঈদ এলেও আমাদের মধ্যে তেমন আনন্দ নেই। নিজের দেশে ঈদ উদযাপন আর ভিন দেশে ঈদ পালন এক নয়। সেখানে আমাদের পূর্বপুরুষদের কবর রয়েছে। প্রতি ঈদে নামাজ শেষে কবর জিয়ারত করতাম, যা এখন আর সম্ভব নয়—এর চেয়ে কষ্ট আর কী হতে পারে।
এ বিষয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ জানান, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে ঈদের জামাত সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।
গত বছর রমজানে ক্যাম্প পরিদর্শনে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা যেন আগামী ঈদ নিজেদের মাতৃভূমিতে উদযাপন করতে পারে-এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় হলেও একজনও রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
রোহিঙ্গাদের মতে, কক্সবাজারের ৩২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থিত ১৫৫০টি মসজিদ ও ১১৫০টি নূরানি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (মত্তব) রয়েছে। এসব মসজিদ ও নূরানি শিক্ষাপ্রতিষ্টানে (আজ) ঈদের নামাজ আদায় করেছেন শরণার্থী রোহিঙ্গারা।
আরাকানে ফেরার আকুতি
এ বিষয়ে টেকনাফের লেদা শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘ঈদ আসলেও আমাদের মাঝে তেমন আনন্দ নেই। কেননা নিজ দেশে ঈদ উদযাপন আর ভিনদেশে ঈদ পালন করা অনেক ভিন্ন। সে দেশে (মিয়ানমারের) আমাদের বাপ-দাদার কবর রয়েছে। যুগ যুগ ধরে সেখানে থাকা অবস্থায় ঈদের নামাজ শেষ করে তাদের কবর জিয়ারত করতাম। কিন্তু এখন সেটা সম্ভব না। এর চেয়ে কষ্ট কি আর হতে পারে।’
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের মুখে পড়ে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে পুরনোদেরসহ উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি শিবিরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে যাদের প্রত্যাশা একটাই, সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে আবার নিজ দেশে ফেরা।










