শুক্রবার | ১২ জুন, ২০২৬ | ২৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ | ২৫ জিলহজ, ১৪৪৭

কোরআনের শিক্ষা

আমরা কি পিপীলিকারও অধম

ড. আমির বিন মুহাম্মদ মাদরি :

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ নামল নামে একটি সুরা নাজিল করেছেন। আরবি নামল শব্দের অর্থ পিপীলিকা। পিপীলিকার বর্ণনা থাকায় সুরার নাম হয়েছে নামল। সুরায় একটি পিপীলিকার সংক্ষিপ্ত সংলাপ বর্ণিত হয়েছে, যেখানে সে নিজ জাতিকে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করছে এবং আত্মরক্ষার পথ বাতলে দিচ্ছে, যা একই সঙ্গে স্বজাতির প্রতি দরদ ও দায়িত্ববোধের বার্তা দেয়। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তারা পিপীলিকা অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছল তখন এক পিপীলিকা বলল, হে পিপীলিকা বাহিনী! তোমরা তোমাদের ঘরে প্রবেশ করো, যেন সুলাইমান ও তাঁর বাহিনী তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে পদতলে পিষে না ফেলে। সুলাইমান তার কথায় মৃদু হাসল।(সুরা : নামল, আয়াত : ১৮-১৯)
কোরআণের বর্ণনা অনুসারে একটি দুর্বল পিপীলিকা স্বজাতিকে সতর্ক করছে, তাদের উদ্বুদ্ব করছে এবং জাতিকে রক্ষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করছে। সে তাদের সামনে আসন্ন বিপদের ভয়াবহতা তুলে ধরছে। প্রশ্ন হলো, একটি পিপীলিকা কি স্বজাতির প্রতি আমাদের চেয়ে বেশি দায়িত্বশীল? ভেবে দেখুন! পিপীলিকা নিজেকে নিয়ে চিন্তিত হয়নি, বরং সে তার জাতিকে নিয়ে চিন্তিত। সে বলেনি, আমি একাই বাঁচব, তোমাদেরকে মৃত্যুর মুখে ফেলে যাব। ছোট হওয়ার পরও সে আওয়াজ নিচু রাখেনি, সে চিৎকার করে ডেকেছে, হে পিপীলিকার দল! যেন সবাই শোনে, সবাই সচেতন হয়। পরিবার, প্রতিবেশী ও স্বজাতির প্রতি পিপীলিকার এই দায়িত্ববোধ কি আমাদের লজ্জিত করে না?
কত মানুষ তার দায়িত্বে অবহেলা করছে, কত প্রহরী ঘুমিয়ে থেকে শত্রুকে সুযোগ করে দিচ্ছে, কত মানুষ পরিবারের বিপদ দেখেও চুপ থাকছে, অথবা নিরাপদে সরে গিয়ে বলছে, আমি পালিয়ে বেঁচেছি। তরুণ হলেও তোমার দায়িত্ব অনেক, একটিমাত্র পিপীলিকা যদি স্বজাতিকে বাঁচাতে পারে, তাহলে একটি মানুষ কেন তাদের রক্ষা করতে পারবে না? তুমি নিজেকে ছোট ও বিচ্ছিন্ন ভেবো না, বোলো না—এতে আমার কি?
প্রতিটি মুসলমান দ্বিন ও উম্মাহর প্রতি দায়িত্বশীল। সুতরাং তোমার কারণে যেন ইসলাম ও মুসলমানের ক্ষতি না হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।
(সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
আত্মমুখী ও স্বার্থপরতার এই সময়ে কত মানুষ তৃপ্ত হয়ে ঘুমায় এবং তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে! কত কর্মজীবী নিজ প্রতিষ্ঠানের ধ্বংস দেখেও নির্বিকার থাকে, অথচ সে বেতনও গ্রহণ করে! কত কর্মকর্তা মানুষকে বিপদে ফেলে নিজে আনন্দের সঙ্গে দিন কাটায়! কত আলেম ও ধর্মপ্রচারক নিজের পদ-পদবি ও সুবিধা রক্ষার জন্য অনাচার দেখেও চুপ থাকে! এসব মানুষ কি পিপীলিকাকে দেখে লজ্জিত হয় না? সে কিন্তু নিজের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে স্বজাতির প্রতি ঈমানদারি দেখিয়েছিল।

ঘটনার শেষ হয়েছে এভাবে—‘সুলাইমান তার কথা শুনে মৃদু হাসল।’ আল্লাহর নবীর এই হাসি তাচ্ছিল্যের ছিল না, এই হাসি ছিল বিস্ময় ও মুগ্ধতার। তিনি পিপীলিকার প্রজ্ঞা, মমতা ও বীরত্ব দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। একজন নবী পিপীলিকার গুণে মুগ্ধ হয়েছেন।

আপনি সতর্ককারী হোন! আপনি কি আপনার পরিবারের দিকে বিপদ আসতে দেখছেন? আপনি কি ফিতনা ও বিকৃতির গন্ধ পাচ্ছেন? আপনি কি সমাজে দুর্নীতির সয়লাব দেখছেন? দয়া করে চুপ থাকবেন না। আপনি সতর্ককারী হোন, আপনি সত্যের ধ্বনি হোন, প্রকম্পন সৃষ্টিকারী কণ্ঠস্বর হোন, যেভাবে পিপীলিকা হয়েছিল। আজ আমরা যারা স্বজাতির ব্যাপারে উদাসীন, যারা ভোগ-বিলাসিতায় সন্তুষ্ট, যারা আত্মমগ্ন হয়ে আছি, আসুন, আমরা উদাসীনতা পরিহার করি। কেননা এখন আমরা পিপীলিকারও অধম!
হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, ‘যে অন্যায় দেখে তা (চুপ থেকে) অনুমোদন করে, সে যেন নিজ পরিবারকে তাতে লিপ্ত করল।’
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে স্বজাতির জন্য সতর্ককারী করুন, পরিবারের জন্য কল্যাণকামী করুন, আমাদের দ্বারা যেন ইসলামের কোনো ক্ষতি না হয়, আমরা যেন দায়িত্বে অবহেলা না করি। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.), পরিবার ও সকল সাহাবির প্রতি শান্তি বর্ষণ করুন। আমিন।
ভাবানুবাদ : মুফতি আবদুল্লাহ নুর

 

 

 

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ