একই ঘরে ছিলেন ১৭ জন, যেভাবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে আছেন শুধু একজন

যোগাযোগ ডেস্ক :

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের বাসিন্দা হাসিবুল পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাস করে স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। চাকরি যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার ছিলেন। তারপর জীবিকার সন্ধানে এবং পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে তিন বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে কাজ করেন একটি সোফা তৈরির কারখানায়। কারখানার ভেতরেই ছিল তাদের আবাসন।
ওইদিনও তিনিকা রখানার ভেতরেই একপাশে তাদের থাকার ঘরে দিনের বেলা বিশ্রাম নিতে ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ কারখানায় আগুন লাগে। আর ওই আগুনেই প্রাণ যায় হাসিবুলের। শুধু তিনি নয় আগুনে পুড়ে মারা যান একই কারখানার আরও ৮ জন এবং কারখানার ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে প্রাণ হারান ৮ জন। এরা সবাই একই কারখানায় কাজ করতেন। মোট ১৭ জনের মধ্যে ঘরে থাকা ১৬ জনই প্রাণ হারান। শুধু প্রাণে বেঁচে গেছেন একজন, যিনি ওই সময় ঘরে ছিলেন না। সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস সুত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ঘুমের মধ্যেই আগুনে মৃত্যু
দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রবিবার দুপুরে আনুমানিক ২টার দিকে রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় বাংলাদেশ কর্মী দ্বারা পরিচালিত একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সুত্রপাত হয়। পরে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর বেরিয়ে আসে একে এক লাশ। ৮ জনের লাশ আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। আর ৮ জন মারা গেছে ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে। কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, কারখানার গেট বন্ধ থাকায় তারা বেরিয়ে আসতে পারেননি।

সৌদি আরবের রিয়াদে একই এলাকায় অবস্থিত অন্য কারখানায় কর্মরতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই কারখানায় ১৭ জন শ্রমিক কাজ করতো। তাদের মধ্যে ১৬ জনই অগ্নিকান্ডে মারা গেছেন। কারখানার ভেতরেই একপাশে তারা বসবাস করতেন। ওই কারখানায় রাতে কাজ হতো, তাই দুপুর বেলা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তারা।

প্রাণে বেঁচে গেছেন একমাত্র হাবিব

একই কারখানায় কাজ করতেন হাবিবুর রহমান নামে অপর এক বাংলাদেশি। তিনি সেদিন দুপুরে দেড়টার দিকে চুল কাটার উদ্দেশ্যে কারখানা থেকে বের হন। চুল কেটে ফিরে এসে দেখেন কারখানায় আগুন লেগেছে। কারখানায় ১৭ জন বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করতেন বলে তিনি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে জানান।

লাশ শনাক্ত করতে ডিএনএ টেস্ট লাগতে পারে

সেই কারখানায় কর্মরত ১৬ জন শ্রমিক মারা গেছেন। এর মধ্যে ৮ জনই মারা গেছেন সরাসরি আগুনে পুড়ে। তাদের লাশ শনাক্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে। দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বী বলছেন, অগ্নিকান্ডে তাদের সবার পাসপোর্ট আর ইকামা পুড়ে গেছে। তাদের পরিচয় শনাক্তে বাংলাদেশের জেলা প্রশাসন এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। সৌদির সংশ্লিষ্ট থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে পরিচয় শনাক্তে আঙ্গুলের ছাপ নেওয়া হবে। তাতে না হলে ডিএনএ পরীক্ষা করা লাগতে পারে। পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করবে। তারপর মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

কারখানায় আগুন লেগে মৃত ১৩ জনই নওগাঁর

সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। নিহতদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁয়, দুজনের নাটোরে এবং একজনের রাজশাহীতে। শনাক্ত হওয়া মৃতদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার উজানপই গ্রামের ফরিদ, ডুবাই গ্রামের শুভ ও সুমন, গন্ডগোহালী গ্রামের মো. রুবেল প্রামাণিক, মো. কলিমউদ্দিন, মো. মোহন ও মো. সুমন, মিনহাজ, বোয়ালা গ্রামের হৃদয়, নওগাঁ গ্রামের শাহিন, খরস্রোতা গ্রামের আব্দুল জলিল ও মজিদুল এবং সাদনগর গ্রামের সাগর রয়েছেন।

এর মধ্যে মো. রুবেল প্রামাণিকের বাবার নাম মো. সাইদুর রহমান। মো. কলিমউদ্দিনের বাবার নাম মৃত বজলুর প্রামাণিক। মো. মোহনের বাবার নাম গুফফার প্রামাণিক এবং মো. সুমনের বাবার নামও গুফফার প্রামাণিক। মজিদুলের বাবার নাম মজনু। মিনহাজের গ্রামের নাম এখনও জানা যায়নি।
নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামের শামিম ও খাজুরা গ্রামের সাব্বির এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মরুগ্রাম, ডাংগাপাড়া গ্রামের শ্যামলও নিহতদের মধ্যে রয়েছেন।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ