বৃহস্পতিবার | ২ এপ্রিল, ২০২৬ | ১৯ চৈত্র, ১৪৩২ | ১৩ শাওয়াল, ১৪৪৭

ওরা শুধু মেরেই যাচ্ছিল’—বর্ণনা প্রত্যক্ষদর্শীদের

যোগাযোগ ডেস্ক

‘আমি নিজের চোখে দেখেছি, ওরা সরাসরি বিক্ষোভকারীদের সারি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছিল, আর মানুষ যে যেখানে ছিল সেখানেই লুটিয়ে পড়ছিল’, দক্ষিণ ইরানের একটি ছোট শহরের বাসিন্দা উমিদ (ছদ্মনাম) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে এভাবেই বর্ণনা দিচ্ছিলেন গত কয়েক দিনের নারকীয় পরিস্থিতির। তার কণ্ঠে ছিল আতঙ্ক আর কান্নার মিশেল।

ইরানে অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়াবহ অভিযানের এমন অসংখ্য বর্ণনা এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। কর্তৃপক্ষের রক্তচক্ষু আর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট উপেক্ষা করে প্রত্যক্ষদর্শীরা যে চিত্র তুলে ধরছেন, তা কোনও যুদ্ধের চেয়ে কম নয়।

তেহরানের এক তরুণী গত বৃহস্পতিবারকে ‘কিয়ামতের দিন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘তেহরানের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোও বিক্ষোভকারীতে ঠাসা ছিল। কিন্তু শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনী শুধু মেরেই যাচ্ছিলো। চারদিকে এত রক্ত আর মৃত্যু দেখে আমি মনোবল হারিয়ে ফেলেছি।’ তার কথঅয়, ‘যুদ্ধে দুই পক্ষের হাতে অস্ত্র থাকে। কিন্তু এখানে মানুষ শুধু স্লোগান দিচ্ছে আর প্রাণ হারাচ্ছে। এটি একটি একতরফা যুদ্ধ।’

বিবিসি ফারসি এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে ভয়াবহ রক্তপাত হয়েছে গত শুক্রবার। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র পিছু হটবে না’, এমন হুঁশিয়ারির পরই বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসজি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, তেহরানের নিকটবর্তী কারাজ ও ফারদিস শহরে মোটরসাইকেলে করে এসে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি লাইভ অ্যামুনিশন বা তাজা গুলি চালানো হয়েছে। এমনকি চিহ্নিত নয় এমন গাড়ি থেকে গলির ভেতরে সাধারণ মানুষের ওপরও গুলি করা হয়েছে। এক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, ‘প্রতিটি গলিতেই দুই থেকে তিনজন মানুষ মরে পড়ে ছিল।’

রেশত শহরের এক সূত্র জানিয়েছে, সেখানকার একটি হাসপাতালের মর্গে বৃহস্পতিবার ৭০ জন বিক্ষোভকারীর মরদেহ আনা হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছে, পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের বিনিময়ে নিরাপত্তা বাহিনী ‘বুলেটের দাম’ হিসেবে অর্থ দাবি করছে। মাশহাদ শহরের এক মর্গ কর্মী জানান, শুক্রবার সূর্য ওঠার আগে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০টি মরদেহ সেখানে আনা হয়, যাদের সবার মাথায় গুরুতর আঘাত ছিল। তাদের দ্রুত দাফন করতে বাধ্য করা হয়।

চিকিৎসক ও নার্সরা জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলো আহত ও নিহতদের ভিড়ে উপচে পড়ছে। বিশেষ করে মাথা ও চোখে আঘাত পাওয়া রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে তেহরানের কাহরিজাক ফরেনসিক সেন্টারে লাশের স্তূপ দেখা গেছে। সেখানে স্বজনরা হন্যে হয়ে নিখোঁজ প্রিয়জনের ছবি ও মরদেহের ব্যাগ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। একটি ভিডিওতে ট্রাক থেকে মরদেহের ব্যাগ নামাতেও দেখা গেছে।

নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, এ পর্যন্ত অন্তত ৬৪৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৯ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। তবে স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সরকারি সংবাদমাধ্যম ১০০ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহতের কথা জানিয়ে বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তবে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, নিহতের সংখ্যা ২ হাজারের মতো। তবে তিনি বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের আলাদা সংখ্যা জানাননি।

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ইরানে এই ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের’ খবরে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘের বিশেষ দূত মাই সাটো প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক মাই সাটো বলেন, মৃতের সংখ্যা যতই হোক না কেন, নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার উদ্বেগজনক।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ