আকাশ আচ্ছন্ন থাকলে রমজানের চাঁদ প্রমাণিত হওয়ার জন্য চাঁদের খবর প্রদানকারী একজন সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন বালেগ, ইসলামী অনুশাসন মান্যকারী নির্ভরযোগ্য মুসলমান হতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর একই বিধান। ঈদের চাঁদ দেখার জন্যও অনুরূপ গুণসম্পন্ন দুজন পুরুষ বা একজন পুরুষ ও দুজন নারী হতে হবে। (আলবিনায়া : ৪/২৫, রদ্দুল মুহতার : ২/৩৯১, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/১৯৭)
আর আকাশ পরিষ্কার থাকলে রমজান ও ঈদের চাঁদ দেখার বিধান হলো, এতসংখ্যক লোক চাঁদের সাক্ষ্য দেওয়া জরুরি, যার দ্বারা মুসলিম বিচারক ও মুফতিদের সমন্বয়ে গঠিত হেলাল কমিটির কাছে তা দৃঢ় বিশ্বাস্য হয়ে যায়।
দুরবিন ও টেলিস্কোপের মাধ্যমে চাঁদ দেখা
ইসলাম মানুষকে কোনো ধরনের জটিল বৈজ্ঞানিক তথ্যাদি ও যন্ত্রপাতির মারপ্যাঁচে না ফেলে সাধারণ চোখে চাঁদ দেখার ওপর বিধানের ভিত্তি রেখেছে। কোনো কারণে ২৯ তারিখে চাঁদ দেখা না গেলে বিচলিত না হয়ে মাস ৩০ দিন পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছে। এ কারণে চাঁদ দেখার জন্য এতটুকু পন্থা অবলম্বন করবে যে এমন জায়গায় গিয়ে চাঁদ দেখার চেষ্টা করবে, যেখানে তার সামনে চন্দ্র উদয়ের স্থলে কোনো প্রতিবন্ধক না থাকে।
ব্যস, এতটুকুই যথেষ্ট। তাই হেলিকপ্টারে উঠে চাঁদ দেখা অথবা দুরবিন, টেলিস্কোপ ইত্যাদির সাহায্য নেওয়াকে ইসলামী শরিয়ত নীতিগতভাবে পছন্দ করে না।
তবে যদি কেউ দুরবিন, টেলিস্কোপ ইত্যাদির সাহায্যে স্বীয় এলাকার চন্দ্র উদয়স্থলে সঠিক সময়ে চাঁদ দেখে নেয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে এবং এর দ্বারা চাঁদ দেখা সাব্যস্ত হয়ে সব বিধি-বিধান আরোপিত হয়ে যাবে। কেননা যেভাবেই হোক সে সঠিক সময়ে এবং সঠিক স্থলে চাঁদ দেখেছে, তা যেকোনো উপায় অবলম্বন করেই হোক না কেন।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া : ২/১১৫)
হিসাবের ভিত্তিতে চাঁদের সিদ্ধান্ত প্রদান
বর্তমানে কিছু লোক চাঁদের অস্তিত্বকেই চাঁদ উদয় ধরে চান্দ্র মাস গণনা করার প্রবক্তা রয়েছেন, তাঁদের দাবি সঠিক নয়।কারণ শরিয়তের বিধান হলো শুধু চাঁদের অস্তিত্ব দ্বারা কেবল চাঁদ দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এই সম্ভাবনার ওপর শরিয়তের মাসায়েলের ভিত্তি নয়; বরং শরিয়তের ভিত্তি হচ্ছে—চাঁদ স্বচক্ষে নিশ্চিতভাবে দেখার ওপর।
হাদিস শরিফে এসেছে, ‘চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা শেষ করো। আর যদি তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট না হয়, তাহলে মাস ৩০ দিন পূর্ণ করো।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯০৯)
অতএব, উদয়স্থলে সন্ধ্যায় নিশ্চিতভাবে চাঁদ দেখা যাওয়ার পর মাস গণনা শুরু হবে।
অনেকে বলতে পারেন যে বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সৌর ক্যালেন্ডারের ন্যায় প্রযুক্তির মাধ্যমে আগে থেকেই চান্দ্র ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে চান্দ্র মাসের হিসাব করা হোক। আসলে যাঁরা এমনটি বলে থাকেন তাঁরা প্রযুক্তির ওপর অতি মাত্রায় ভক্তি রাখা সত্ত্বেও বাস্তবতা তাঁদের জানা নেই। কেননা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাই এ কথা স্বীকার করেন যে সৌর ক্যালেন্ডারের ন্যায় নিশ্চিতভাবে স্থায়ী চান্দ্র ক্যালেন্ডার তৈরি করা সম্ভব নয়। কেননা চাঁদ এক দিন আগে-পরে দেখার এবং চাঁদ দেখা যাওয়ার বহু কারণ ও পরিবর্তনশীল নিয়ামক রয়েছে। পরিভাষায় যাকে বলা হয় চাঁদ দেখার
Veriable তথা ‘চলক’। এ রকম Veriable আছে প্রায় ছয় হাজার। সব Veriable সমন্বয় করে এবং যোগ-বিয়োগ করে নিশ্চিত ফল দাঁড় করানো এখনো সম্ভবের পর্যায়ে আসেনি। এ জন্যই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও এ কথা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না কোন মাস ২৯ দিনে বা কোন মাস ৩০ দিনে হবে। তাঁরা যে লুনার ক্যালেন্ডার বের করেন তা সম্ভাবনাভিত্তিক, নিশ্চিত নয়। এ কারণেই অনেক মাস লুনার ক্যালেন্ডারের বর্ণনা থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে, যা আমরা প্রায়ই দেখতে পাই। স্বয়ং একাধিক লুনার ক্যালেন্ডারের মধ্যেও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।
চাঁদ উদয়ের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের তথ্য গ্রহণের ইসলামী নীতি
পূর্বোক্ত আলোচনায় এ কথা স্পষ্ট হলো যে শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তৈরি করা লুনার ক্যালেন্ডারের তথ্যের ওপর নির্ভর করে চাঁদ উদয়ের ঘোষণা দেওয়া যাবে না, বরং প্রত্যক্ষ দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই চাঁদের ঘোষণা দিতে হবে। এখন কথা হলো, জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কথার ওপর নির্ভর করে চাঁদ উদয়ের সম্ভাবনা নাকচ করার বিধান কী? অর্থাৎ যখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব মতে, অমুক দেশে চাঁদ দেখা যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই, তা সত্ত্বেও দুই সাক্ষী চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিচ্ছে, এ অবস্থায় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতামতের ওপর নির্ভর করে তাদের সাক্ষ্য নাকচ করা যাবে কি না? মুফতিদের নির্ভরযোগ্য মতামত হলো, এ ক্ষেত্রে তাদের কথা গ্রহণযোগ্য হবে। অর্থাৎ ওই অবস্থায় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতামতের ওপর নির্ভর করে তাদের সাক্ষ্য নাকচ করা যাবে। কেননা বিজ্ঞানীদের কিছু তথ্য হলো অনুমাননির্ভর ও সন্দেহপূর্ণ, যেমন—চাঁদ দেখা যাওয়ার তথ্যটি সন্দেহপূর্ণ, তাই শরিয়ত তার ওপর নির্ভর না করে প্রত্যক্ষ দর্শনের ওপর নির্ভর করতে বলে।
কিন্তু চাঁদ উদয় ও দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকার ব্যাপারে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যে তথ্য দিয়ে থাকেন তা শুধুু অনুমাননির্ভর নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক হিসাবনির্ভর হয়ে থাকে। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সঠিক তথ্যের আলোকে যদি বলেন যে আজ চাঁদ দেখা যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, সে ক্ষেত্রে কেউ যদি চাঁদ দেখার দাবি করে, তাহলে ওই দাবি ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বা প্রায় নিশ্চিত। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কথার ওপর নির্ভর করে দু-একজনের সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করা যাবে। তা ছাড়া সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তথ্যকে সহযোগী হিসেবে সামনে রাখলে সাক্ষীদের প্রতারণা অথবা অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে। (ইনআমুল বারি : ৫/৪৯৫, তাসহীলুল ফলকিয়াত, পৃষ্ঠা-২৪৭)










