বুধবার | ১ এপ্রিল, ২০২৬ | ১৮ চৈত্র, ১৪৩২ | ১২ শাওয়াল, ১৪৪৭

চুক্তির প্রয়োজন নেই, ২-৩ সপ্তাহে শেষ হতে পারে ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প

যোগাযোগ রিপোর্ট

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করা এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধ শেষ করার জন্য কোনো চুক্তির প্রয়োজন নেই।

তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মঙ্গলবার আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে বার্তা আদান-প্রদান চললেও কোনো ধরনের আলোচনা বা সমঝোতা হচ্ছে না। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পার হয়েছে।

এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে ইরান আলোচনার টেবিলে আছে এবং তারা একটি চুক্তির জন্য ‘ভিক্ষা’ করছে। তবে মঙ্গলবার তথাকথিত এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বিষয়ে তার সুর কিছুটা বদলে গেছে বলে মনে হচ্ছে।

হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেন, যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য সফল কূটনীতি কোনো পূর্বশর্ত কি না– তখন তিনি বলেন, ‘ইরানকে কোনো চুক্তি করতে হবে না, না।’

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই সেখান থেকে চলে আসবে— ‘হয়ত দুই সপ্তাহ, বড়জোর তিন সপ্তাহ।

ট্রাম্প বলেন, ‘যখন আমাদের মনে হবে যে তারা দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রস্তর যুগে ফিরে গেছে এবং তারা আর কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না, তখনই আমরা চলে আসব।’

যদিও ইরান সব সময়ই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেনি।

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ইরান বিষয়ক পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পারসি আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের এই বক্তব্যগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এবং হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া এই সংঘাত থেকে ট্রাম্পের পক্ষে হুট করে ‘বেরিয়ে আসা’ এত সহজ হবে না।

এই যুদ্ধে ইরান ও লেবাননে—যেখানে ইসরায়েল বিমান হামলার পাশাপাশি স্থল অভিযান চালাচ্ছে—প্রচুর বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
পারসি বলেন, ‘মনে করে দেখুন, শুরুতে তারা বলেছিল এই যুদ্ধ চার দিনে শেষ হবে। তারপর তিন সপ্তাহ আগে তারা বলেছিল এতে তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। এখন তিন সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ার পর আমরা আবার শুনছি যে এটি শেষ হতে আরও দুই-তিন সপ্তাহ লাগবে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘সময়সীমা কেবল পেছানোই হচ্ছে।

কারণ দিনশেষে এই যুদ্ধের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’ তিনি এই পরিস্থিতিকে একটি ‘বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
পারসি মনে করেন, ‘প্রকৃত আলোচনার মাধ্যমে ট্রাম্পের জন্য যত দ্রুত সম্ভব এটি শেষ করা অনেক ভালো হতো। এ পর্যন্ত যেসব দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা দিয়ে কাজ হবে না। অন্যথায়, তিন সপ্তাহ পরে আমরা আবারও শুনব যে এটি শেষ হতে আরও তিন সপ্তাহ সময় লাগবে।’

‘নিজেদের তেল নিজেরাই জোগাড় করো’
ট্রাম্পের এ মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন ইরানে হামলার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালীতে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ঘরোয়া বাজারে পেট্রোলের গড় দাম গ্যালন প্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে যাতায়াত করে।

তবে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকায় ট্রাম্প সেইসব মিত্র দেশগুলোর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যারা হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক সহায়তা দেওয়ার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোকে লক্ষ্য করে বলেন, যারা ‘ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার কাজে অংশ নিতে অস্বীকার করেছে’, তারা যেন হয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে জ্বালানি কেনে অথবা এই দ্রুত বাড়তে থাকা যুদ্ধে যোগ দেয়।

তিনি বলেন, ‘আপনাদের নিজেদের জন্য লড়াই করা শিখতে হবে। আমেরিকা আর আপনাদের সাহায্য করতে আসবে না, ঠিক যেমন আপনারা আমাদের পাশে দাঁড়াননি। ইরান মূলত ধ্বংস হয়ে গেছে। কঠিন কাজ শেষ। এখন নিজেদের তেল নিজেরাই জোগাড় করে নিন।’

এর আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রধান পিট হেগসেথ যুদ্ধে যোগ দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অনিচ্ছার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি শেষবার যখন খোঁজ নিয়েছিলাম, তখন জানতাম একটি শক্তিশালী রয়্যাল নেভি আছে যারা এ ধরনের কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকার কথা।’

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা সচিব জন হিলি এ সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। কাতার সফরকালে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান মিত্র হিসেবেই আছে।

অন্য একটি পোস্টে ট্রাম্প ফ্রান্সের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ ঝাড়েন এবং দেশটিকে ‘খুবই অসহযোগিতামূলক’ বলে অভিহিত করেন। বিশেষ করে ইসরায়েলগামী সামরিক সরঞ্জামবাহী বিমানগুলোকে ফ্রান্সের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না দেওয়ার কারণে তিনি বিরক্ত।

প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, ইরানে হামলার জন্য ফরাসি ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল।

তারা বলেছে, ‘আমরা এই টুইট দেখে অবাক হয়েছি। যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই ফ্রান্স তার অবস্থানে অনড় আছে এবং আমরা আমাদের এই সিদ্ধান্তের কথা আবারও নিশ্চিত করছি।’

বিশেষজ্ঞ পারসি বলেন, ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করাকে মার্কিন যুদ্ধের লক্ষ্য নয় বলে দাবি করে আসলে একটি ‘সাফল্যের গল্প’ তৈরি করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু একইসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয় দেশগুলো এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খুলে দিতে সহায়তা না করায় হতাশা প্রকাশ করছেন।

পারসি প্রশ্ন তোলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী নৌবাহিনী আছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এটি করতে না পারে, তবে ফরাসি বা অন্য ইউরোপীয়রা এসে কী পার্থক্য গড়ে দেবে?’ তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ইরান হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করতে থাকবে এবং সম্ভবত সেখানে হামলাও চালিয়ে যাবে।

পারসি আরও উল্লেখ করেন, ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার ট্রাম্পের এই দাবি আসলে আমেরিকার যুদ্ধের লক্ষ্যগুলোকে ‘ইসরায়েলীকরণ’ করার নামান্তর।

তিনি বলেন, ‘সরায়েলিরা ঠিক এভাবেই যুদ্ধ চালায়। তাদের কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য নেই; তারা কেবল চায় তাদের প্রতিবেশীরা যেন যতটা সম্ভব দুর্বল থাকে। তাই প্রতি দুই-তিন বছর অন্তর তারা তাদের ওপর বোমা ফেলে।’ ফিলিস্তিনিদের ওপর গত কয়েক দশকের ইসরায়েলি হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি একে ‘ঘাস কাটার কৌশল’ (mowing the lawn strategy) হিসেবে অভিহিত করেন।

সোমবার একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ‘মিশনের দিক থেকে অর্ধেকের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে, যদিও সময়ের দিক থেকে সেটা নাও হতে পারে।’ উল্লেখ্য, গাজায় গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘তবে আমি এর শেষ হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে চাই না।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ