একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে ত্রয়োদশ নির্বাচন; এই সাত বছরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একাধিক শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতার আয় ও সম্পদ বেড়েছে কয়েকগুণ। বিগত সময়ে রাজনৈতিক মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত থাকার পরও জামায়াতের কোনো কোনো নেতার বার্ষিক আয় দ্বিগুণ হয়েছে, কারও বেড়ে তিনগুণ। কেউ কেউ নিজের চেয়ে স্ত্রীর নামে সম্পদ দেখিয়েছেন কয়েকগুণ বেশি। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে জামায়াত নেতাদের আয় ও সম্পদের এই চিত্র উঠে এসেছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কয়েকটি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। একাদশ নির্বাচনেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জোটে থেকে নির্বাচনে অংশ নেয় জামায়াত। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীকে ২২টি আসনে ছাড় দিয়েছিল বিএনপি। জামায়াত তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ছিল। ওই সময় নিবন্ধন বাতিল থাকায় জামায়াতের প্রার্থীরা বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে লড়াই করেন। শুধু কক্সবাজার-২ আসনে দলের জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ ভিন্ন প্রতীকে নির্বাচন করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রতীকসহ জামায়াতের নিবন্ধন পুনর্বহাল হয়। এবার দাঁড়িপাল্লা প্রতীকেই জামায়াতের প্রার্থীরা ভোটে রয়েছেন। মাঝে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত একতরফা দ্বাদশ নির্বাচনে অংশ নেয়নি দলটি।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে জামায়াতের যারা প্রার্থী হয়েছেন, বিধি অনুযায়ী তারা নিজেদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের তথ্য হলফনামা আকারে জমা দিয়েছেন মনোনয়নপত্রের সঙ্গে, যা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
গোলাম পরওয়ারের অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে পৌনে ১০ লাখ : খুলনা-৫ আসন থেকে নির্বাচন করছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। ২০২৬ সালের হলফনামায় তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি। গোলাম পরওয়ারের আয়ের একমাত্র উৎস ব্যবসা। এখান থেকে বছরে আয় হয় সাড়ে চার লাখ টাকার বেশি। ব্যবসার মাধ্যমে তিনি বছরে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা আয় করেন। তার ওপর নির্ভরশীলদের বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৩ হাজার ৩৩০ টাকা। মিয়া পরওয়ারের স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে অকৃষিজমি ও ভবন, যার অর্জনকালীন মূল্য ২২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে পরওয়ারের ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা নগদ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৭ লাখ ২৪ হাজার ৭৩৩ টাকা জমা থাকার কথা এবারের হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া তিনি ৮০ হাজার ৬৫০ টাকা মূল্যের ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং ১ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবের কথাও উল্লেখ করেছেন। সব মিলিয়ে তার অস্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য ১৫ লাখ ৫ হাজার ৩৮৩ টাকা।
২০১৮ সালের হলফনামায় গোলাম পরওয়ার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য দেখিয়েছিলেন ৭৫ লাখ ১২ হাজার ১ টাকা। এখান থেকে বছরে আয় ছিল ২ লাখ ৯১ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে ছিল অকৃষিজমি ও ভবন, যার অর্জনকালীন মূল্য ২২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে পরওয়ারের ৪৪ হাজার ৮৭৫ টাকা নগদ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ১২৬.১৮ টাকা দেখিয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি ৬০ হাজার টাকা মূল্যের ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং ৫০ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবের কথাও উল্লেখ করেন। সব মিলিয়ে তার অস্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য ৫ লাখ ২০ হাজার ৩৩৮ টাকা।
দুই হলফনামার সঙ্গে তুলনা করলে গত সাত বছরে সাবেক সাংসদ গোলাম পরওয়ারের বছরে আয় বেড়েছে এক লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ টাকা। অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৪৫ টাকা। এর মধ্যে নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ৫ লাখ ৪৫ হাজার ১২৫ টাকা।
৭ বছরে আমিরের সম্পদ বেড়েছে ২৭ লাখের বেশি : ঢাকা-১৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের প্রায় দেড় কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। এবারের হলফনামায় তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ মোট ১ কোটি ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার ৪৭৪ টাকা। কৃষি খাত থেকে ৩ লাখ টাকা ও অন্য উৎস থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করেছেন শফিকুর রহমান। স্থাবর সম্পদের মধ্যে কৃষিজমি রয়েছে ২১৭ শতক, যার অর্জনকালীন মূল্য ১৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা। অকৃষি ১৩ শতক জমির অর্জনকালীন মূল্য ২ লাখ ৫৪ হাজার ৮৩৪ টাকা। ১১ দশমিক ৭৭ শতকের ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে শফিকুর রহমানের; অধিগ্রহণকালে যার মূল্য ছিল ২৭ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ৪৭ লাখ ২৫ লাখ ৮৩৪ টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে জামায়াত আমিরের। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে জামায়াত আমিরের নগদ রয়েছে ৬০ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৭ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে ৪ লাখ ৯০ হাজার ২৬৩ টাকা। তার বন্ড, ঋণপত্র স্টক, এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির শেয়ার রয়েছে ২৭ লাখ ১৬ হাজার ৮৮০ টাকার। শফিকুর রহমানের রয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দামের গাড়ি ও ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, যার অর্জনকালীন দাম ১ লাখ টাকা। রয়েছে ২ লাখ টাকার ইলেকট্রনিকসামগ্রী ও ২ লাখ ৪০ হাজার টাকার আসবাব। সব মিলিয়ে তার অস্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য এক কোটি ২ লাখ ৭৩ হাজার ৬৪০ টাকা।
২০১৮ সালের হলফনামায় শফিকুর রহমান ১ কোটি ২২ লাখ ৭৯ হাজার ৭৪ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব দিয়েছিলেন। এর মধ্যে স্থাবর সম্পদের হিসাব দেখিয়েছিলেন ২৯ লাখ ৫৪ হাজার ৮৩৪ টাকা ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব দেখিয়েছিলেন ৯৩ লাখ ২৪ হাজার ২৪০ টাকা। তবে হলফনামায় জামায়াত আমির বার্ষিক আয় দেখাননি। এবারের হলফনামার সঙ্গে তুলনা করলে গত সাত বছরে জামায়াত আমিরের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৭ লাখ ২০ হাজার ৪০০ টাকার।
টানা তৃতীয় মেয়াদে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের দায়িত্ব পাওয়া শফিকুর রহমান ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি ছিলেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল।
এবারও তাহেরের তুলনায় স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে কয়েকগুণ : এবারের নির্বাচনে কুমিল্লা-১১ আসনে নির্বাচন করছেন জামায়াতের প্রার্থী কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তার চেয়ে স্ত্রী ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরীর সম্পদ চারগুণ বেশি। হলফনামায় এ বছর তাহেরের সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে এক কোটি ৮০ হাজার ১৯২ টাকা এবং তার স্ত্রীর চার কোটি ৬৪ লাখ ২০ হাজার ৫৫৫ টাকা।
হলফনামার তথ্য মতে, এই প্রার্থীর অস্থাবর সম্পদের মধ্যে আছে নগদ ৫১ লাখ আট হাজার ২২৪ টাকা। তার স্ত্রীর নামে আছে ২১ লাখ ৯১ হাজার ৯৬৮ টাকা। এ ছাড়া প্রার্থীর নামে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বন্ড, ঋণপত্র, সঞ্চয়পত্র, স্থায়ী আমানত, স্বর্ণালংকার, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাব মিলিয়ে রয়েছে ৮৫ লাখ টাকার সম্পদ। স্ত্রীর নামে রয়েছে এক কোটি ৭০ লাখ টাকার সম্পদ। স্থাবর সম্পদের মধ্যে প্রার্থীর নামে রয়েছে কৃষি ও অকৃষিজমি, যার মূল্য এক কোটি টাকা। তার চিকিৎসক স্ত্রীর নামে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ও জমিসহ পাঁচ কোটি ৫০ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে।
২০১৮ সালের হলফনামায়ও নিজের চেয়ে স্ত্রীর সম্পদ বেশি দেখিয়েছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। হলফনামার তথ্য মতে, তাহেরের অস্থাবর-স্থাবর সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছিলেন ২ কোটি ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৭৭ টাকার। অন্যদিকে স্ত্রীর অস্থাবর-স্থাবর সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছিলেন ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৭ টাকার।
আযাদের বার্ষিক আয় বেড়েছে প্রায় তিনগুণ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেন দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। প্রাথমিক বাছাইয়ে তার মনোনয়নপত্র অবৈধ হয়েছে। হলফনামায় তিনি নিজের বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১৯ লাখ ২৭ হাজার ৪৭৯ টাকা। স্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য দেখিয়েছেন ৬০ লাখ ৯০ হাজার ১৬৫ টাকা তবে তার স্ত্রীর স্থাবর সম্পদের মূল্য ১ কোটি ১৬ লাখ ৬ হাজার ২৬৪ টাকা। নগদ ৪৭ লাখ ৫৬ হাজার ১৮৭ টাকাসহ তিনি আনুমানিক ৮১ লাখ ৭৬ হাজার ২৭১ মূল্যের অস্থাবর সম্পদের মালিক। বছরে বাড়ি ভাড়া বাবদ হামিদুর আয় করেন ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৪৩৫ টাকা ও সঞ্চয় বাবদ আয় রয়েছে ১২ হাজার ২৬৭ টাকা। এ ছাড়া চলতি ২৫-২৬ অর্থবছরে তিনি জমি বিক্রি থেকে লাভ বাবদ ১৪ লাখ ৪১ হাজার ৭৭৭ টাকা আয় করেছেন।
২০১৮ সালের হলফনামায় হামিদুর রহমান বার্ষিক আয় দেখিয়েছিলেন ৫ লাখ ১৯ হাজার ৫৩৭ টাকা। স্থাবর সম্পদের হিসাব দেখিয়েছিলেন ৩৪ লাখ ৫২ হাজার ৩৫০ টাকার। তবে স্ত্রীর স্থাবর সম্পদের মূল্য ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার ৩৫০ টাকা। তবে স্ত্রীর নামে থাকা ১.২৫ কাঠার দালানের মূল্য উল্লেখ করেননি। নগদ ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকাসহ হামিদুর রহমান আযাদ আনুমানিক ১৫ লাখ ৯ হাজার ৩৬৯ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদের মালিক।
এবারের হলফনামার সঙ্গে তুলনা করলে গত সাত বছরে আযাদের বার্ষিক আয় বেড়েছে প্রায় তিনগুণ, যা টাকায় ১৪ লাখ ৭ হাজার ৯৪২। স্থাবর সম্পদ বেড়েছে ২৬ লাখ ৩৭ হাজার ৮১৫ টাকা। স্ত্রীর স্থাবর সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ২৫ হাজার ৯১৪ টাকা। এ ছাড়া হামিদুর রহমান আযাদের অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে ৬৬ লাখ ৬৬ হাজার ৯০২ টাকার। হামিদুর রহমান আযাদ ২০০৮ সালে কক্সবাজার-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সাঈদীপুত্রের বার্ষিক আয় বেড়েছে আড়াই লাখের বেশি : ত্রয়োদশ নির্বাচনে পিরোজপুর-২ আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলটির প্রয়াত নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী। যদিও ২০২৮ সালের নির্বাচনে তিনি পিরোজপুর-১ আসন থেকে ভোট করেন। (সূত্র: সময়ের আলো)










