সোমবার | ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ | ৩০ চৈত্র, ১৪৩২ | ২৪ শাওয়াল, ১৪৪৭

নেত্রকোনা

টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিচ্ছে রোহিঙ্গারা

যোগাযোগ ডেস্ক:

নেত্রকোনায় অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) করে দেওয়ার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নেত্রকোনা সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসের একটি সংঘবদ্ধচক্র নিয়মবহির্ভূতভাবে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। এর মাধ্যমে তারা পাচ্ছে বাংলাদেশি নাগরিকত্বের পরিচয়, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দাঁড়াচ্ছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জান্নাত বেগমের নামে তৈরি করা হয়েছে একটি জাতীয় পরিচয়পত্র।

ওই এনআইডির নম্বর ৩৩৩১০৮৯৫৮৫। পরিচয়পত্রে বাবার নাম দেখানো হয়েছে মো. আব্দুল হাসিম, মাতার নাম মোসা. আনজু এবং ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে নেত্রকোনা সদর উপজেলার পুকুরিয়া গ্রাম। কিন্তু এসব তথ্য যাচাই করতে গিয়ে উঠে আসে অসংগতি।

অনুসন্ধানে মা-বাবার এনআইডি যাচাই করে দেখা যায়, আব্দুল হাসিম ও আনজু প্রকৃতপক্ষে স্বামী-স্ত্রী এবং তাঁরা নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার বিরামপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা।প্রায় ১০ বছর আগে আব্দুল হাসিম মৃত্যুবরণ করেন। তাঁদের সংসারে চার ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। একমাত্র মেয়ের নাম সিগ্ধা আক্তার হাসি। জান্নাত বেগম নামে তাঁদের কোনো কন্যাসন্তান নেই।

পরিবারের সদস্য মোতাহার হোসেন এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার জান্নাত বেগম নামে কোনো বোন নেই। আমার একমাত্র বোন সিগ্ধা আক্তার হাসি। আট বছর আগে তাঁর ধর্মপাশা সদরে বিয়ে হয়েছে এবং সে সেখানকার ভোটার।’

স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্যেও একই তথ্য উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আলী নূর বলেন, ‘আব্দুল হাসিম ও আনজুর সংসারে জান্নাত বেগম নামে কোনো মেয়েসন্তান নেই।

যদি কেউ তাঁদের পরিচয় ব্যবহার করে ভোটার হয়ে থাকে, তবে সেটা সরাসরি জালিয়াতি।’

 

অনুসন্ধানে ভোটার ডাটা এন্ট্রির প্রুফ কপিতে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরেও গরমিল পাওয়া যায়। নম্বরটিতে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে জানা যায়, নম্বরটির ব্যবহারকারী আরফান শাকিল। তিনি ময়মনসিংহের আকুয়া এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য চীনে অবস্থান করছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি জানান, জান্নাত বেগম নামের তাঁর কোনো পরিচিত নেই। আরো ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে জন্ম নিবন্ধন যাচাইয়ে। জান্নাত বেগমের নামে নির্বাচন অফিসে সংরক্ষিত জন্ম নিবন্ধনের কপি নিয়ে নেত্রকোনা পৌরসভায় যোগাযোগ করা হলে কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই জন্ম নিবন্ধনটি তাদের সার্ভারে নেই। এটি অন্য একটি জন্ম নিবন্ধন স্ক্যান করে ডিজিটালভাবে এডিট করে তৈরি করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য পূরণ করা ফরম-২ পর্যালোচনায়। সেখানে শনাক্তকারী, সুপারভাইজার ও যাচাইকারীর এনআইডি নম্বর দেওয়া হলেও সার্ভারে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন অফিসের একাধিক কর্মচারী কালের কণ্ঠকে জানান, জান্নাত বেগম একজন রোহিঙ্গা। দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁকে ভোটার করা হয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার সিহাব উদ্দিন এই এনআইডি করে দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আরেক কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন। এমনভাবে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি এনআইডি করা হয়েছে।

ভোটার ফরম-২-এ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সিহাব উদ্দিনের স্বাক্ষরও পাওয়া গেছে। স্বাক্ষরের নিচে তারিখ উল্লেখ রয়েছে ২১ মার্চ, ২০২৫।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সিহাব উদ্দিন বলেন, ‘ভোটার হালনাগাদের সময় জান্নাত বেগম ভোটার হয়েছেন। এতগুলো এনআইডি আলাদাভাবে যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই পরিচয়পত্র তৈরিতে কোনো লেনদেন হয়নি।’

জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন বলেন, ‘আমরা বিষয়টি তদন্ত করব। যদি তিনি রোহিঙ্গা হয়ে থাকেন, তাহলে যারা সহযোগিতা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, ‘তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উল্লেখ্য, এর আগেও নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের ভুয়া কাগজপত্র তৈরির ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ ডিসেম্বর মোহনগঞ্জ উপজেলায় ইউএনওর আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ১৩ রোহিঙ্গার জন্ম নিবন্ধন তৈরি করার ঘটনায় শাওন নামের এক কম্পিউটার দোকানদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ছাড়া কলমাকান্দা উপজেলার রামনাথপুর পাগলা এলাকায় এক রোহিঙ্গা অর্থের বিনিময়ে কামরুল হাসান নামের জাতীয় পরিচয়পত্র (১৯৮২৪৭৯৭৩৩) এবং বাংলাদেশি পাসপোর্ট (এ ০৯৫০৯৫৮৮) সংগ্রহ করার ঘটনাও ঘটে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ