একসময় নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তান নেওয়ার বিষয়টি ছিল নিছক ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক দম্পতিকেই সামাজিক চাপ, মানসিক যন্ত্রণা ও হতাশার ভেতর দিয়ে জীবন কাটাতে হতো। কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি বা এআরটি আজ নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য এক নতুন আশার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
এই এআরটি ও এর বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল, যিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।
এআরটি কী?
সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি বা এআরটি বলতে এমন সব চিকিৎসা পদ্ধতিকে বোঝায়, যেখানে স্বাভাবিক যৌন মিলনের বাইরে গিয়ে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর সংযোগ ঘটিয়ে গর্ভধারণে সহায়তা করা হয়। এই প্রযুক্তিগুলো মূলত সেই দম্পতিদের জন্য, যাদের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক উপায়ে সন্তান ধারণ সম্ভব হচ্ছে না বা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এআরটির আওতায় সবচেয়ে পরিচিত পদ্ধতি হলো ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফ। তবে এর পাশাপাশি ইন্ট্রা ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন (আইইউআই), ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন (আইসিএসআই), ডোনার ডিম্বাণু বা শুক্রাণু ব্যবহার, এমনকি সারোগেসির মতো ব্যবস্থাও রয়েছে।
আইভিএফ কীভাবে কাজ করে?
আইভিএফ পদ্ধতিতে নারীর শরীর থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পুরুষের শুক্রাণুর সঙ্গে নিষিক্ত করা হয়। নিষিক্ত হওয়ার পর ভ্রূণ তৈরি হলে তা নির্দিষ্ট সময় পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং উপযুক্ত হলে নারীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়।
অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজলের মতে, ‘আইভিএফ কোনো জাদুকরি সমাধান নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা প্রক্রিয়া। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, হরমোনের ভারসাম্য ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় সফলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কারা আইভিএফের জন্য উপযুক্ত?
সব নিঃসন্তান দম্পতির জন্য আইভিএফ প্রয়োজন হয় না। সাধারণত যেসব ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির কথা ভাবা হয়-
- নারীর ফলোপিয়ান টিউব বন্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে
- দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও গর্ভধারণ না হলে
- পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতিশীলতা অত্যন্ত কম হলে
- অজ্ঞাত কারণে বন্ধ্যাত্ব
- বয়স বেশি হয়ে যাওয়ার কারণে প্রাকৃতিক গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে গেলে
- তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিস্তারিত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।
আইইউআই: এ পদ্ধতিতে বাছাই করা উন্নতমানের শুক্রাণু সরাসরি নারীর জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়। এটি তুলনামূলক সহজ ও কম ব্যয়বহুল পদ্ধতি, তবে সবার ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে।
আইসিএসআই: এখানে একটি নির্দিষ্ট শুক্রাণু সরাসরি ডিম্বাণুর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। পুরুষ বন্ধ্যাত্বের জটিল ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর।
ডোনার ডিম্বাণু বা শুক্রাণু: যেসব ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষের নিজস্ব ডিম্বাণু বা শুক্রাণু কার্যকর নয়, সেখানে দাতার ডিম্বাণু বা শুক্রাণু ব্যবহার করা হয়।
ভ্রূণ সংরক্ষণ: আইভিএফ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত ভ্রূণ তৈরি হলে তা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা যায়, যা পরে আবার ব্যবহার করা সম্ভব।
বয়স ও সাফল্যের সম্পর্ক
এআরটির সফলতা অনেকাংশেই নারীর বয়সের ওপর নির্ভরশীল। সাধারণত ৩০ বছরের নিচে আইভিএফের সফলতা তুলনামূলক বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর মান ও সংখ্যা কমে যায়, ফলে সফলতার হারও হ্রাস পায়।
অধ্যাপক কাজল বলেন, ‘অনেক দম্পতি দেরিতে চিকিৎসকের কাছে আসেন। সময়মতো সিদ্ধান্ত নিলে চিকিৎসার ফলাফল আরও ভালো হতে পারে।’
মানসিক প্রস্তুতি কেন জরুরি?
এআরটি বা আইভিএফ শুধু শারীরিক চিকিৎসা নয়, এটি মানসিকভাবেও দম্পতির জন্য বড় একটি যাত্রা। একাধিক ধাপে চিকিৎসা, সফলতা-ব্যর্থতার দোলাচল, আর্থিক চাপ সব মিলিয়ে মানসিক দৃঢ়তা খুব প্রয়োজন। চিকিৎসকের পাশাপাশি পরিবার ও সঙ্গীর সমর্থন এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।










