শুক্রবার | ৩ এপ্রিল, ২০২৬ | ২০ চৈত্র, ১৪৩২ | ১৪ শাওয়াল, ১৪৪৭

দোয়া-দরূদ-কোরআন তেলাওয়াতে কেটেছে তারেক রহমানের দিন

নীরব-নিস্তব্ধ খালেদা জিয়ার বাসভবন ফিরোজা

যোগাযোগ ডেস্ক:

 

স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবনটি ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একমাত্র ঠিকানা। কিন্তু ফ্যাসিস্ট হাসিনা প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সেই বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয় বেগম জিয়াকে। এরপর গুলশানের বাসভবন ফিরোজাতেই ছিলেন জীবনের বাকী সময়। ২০১৮ সালের কারাগারে যাওয়া, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কিংবা বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণ ছাড়া পুরো সময়ই খালেদা জিয়ার কেটেছে এই বাসাটিতে। তার উপস্থিতিতে ফিরোজার আশপাশে সব সময় ছিল নেতাকর্মীদের ভিড়, বাড়ির ভেতরে থাকতো আত্মীয়-স্বজন, অনুমোদিত নেতা, বিভিন্ন প্রতিনিধিদের আনাগোনা। তাঁর মৃত্যুর পর ফিরোজার নিরাপত্তা কর্মীরা এখনো পাহারা দিচ্ছেন বাড়িটি। প্রহরী ছাউনি রয়েছে ঠিক আগের মতোই। নেই শুধু বেগম খালেদা জিয়া। কাল থেকে নিরব-নিস্তব্ধ হয়ে আছে গুলশানের সেই বাসভবন ফিরোজা।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের অনেক স্মৃতি এই বাসায়, যারা বাড়ির সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত তাদের আবেগ-অনুভূতিও রয়েছে উনাকে ঘিরে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছে যারা দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময়ে বিশেষ করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্যারের ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবনে ভালোবাসার পরশ নিয়ে এখনো আছেন ফিরোজার চারপাশে। চেয়ারপারসনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমিও সেই অনুভূতিটা উপলব্ধি করছি যা ভাষায় প্রকাশ করা এই মুহূর্তে মানসিকতা আমার নেই। সত্যিই এই বাসা যেন ম্যাডামকে এখন দেখি জীবন্ত ম্যাডাম হিসেবে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ)-এর একজন সদস্য বলেন, ম্যাডামের ডিউটি করতাম। আজকে ম্যাডাম নেই, পুরো বাড়িটাই খালি। বাড়ির ভেতরে ঢুকলে কেমন জানি একটা শূন্যতা, কেমন জানি একটা নিস্তব্ধতা কানে আসে। ভাই, এই কষ্ট ও বেদনার কথা বলার ভাষা নেই। দোয়া করি, আল্লাহ যেন ম্যাডামকে ভালো রাখেন পরপারে।

আরেক নিরাপত্তা কর্মী বলেন, ম্যাডাম সব সময় আমাদের খোঁজ-খবর রাখতেন। বিকাল অথবা দুপুরে খবর নিতেন আমরা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছি কিনা। উনি ছিলেন আমাদের প্রাণের মা।
গতকাল দেখা যায়, ফিরোজায় দায়িত্বপালনরত নিরাপত্তার কর্মীরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেছে। তাদের চোখে-মুখে শোকের ছায়া ফুটে উঠেছে।

‘১৯৬ নং বাসা’ :
ফিরোজার পাশের লাগোয়া বাসাটি হচ্ছে ১৯৬ নম্বর বাসা। এটি ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করার পর তার পরিবারের জন্য খালেদা জিয়ার নামে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকার বরাদ্দ দিয়েছিলো। এই বাড়িটির দলিলসহ কাগজপত্র বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ফিরোজায় এসে বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন কয়েক মাস আগে। সেই বাসাটিতে উঠেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

সেই বাসার সামনে নিরাপত্তা কর্মীরা যারা দায়িত্বরত তাদের মধ্যেও শোকের ছায়া দেখা গেছে। গুলশান এভিনিউ ডিপ্লোমেটিক জোনের মধ্য পাড়ায় সেখানে নেতা-কর্মীদের ভিড় সেভাবে নেই। তবে যৎসামান্য যারা আছেন তাদের মধ্যে গুলশানের বাসিন্দা হাসানুজ্জামান খান বলেন, এই কাছাকাছি থাকি। বিকালে হেঁটে একটু আসলাম এই বাড়ির সামনে। কঠোর নিরাপত্তা দেখতেই পারছেন। ম্যাডাম নেই, এখন ভরসার জায়গাটা তারেক রহমান। সেইজন্য এখানে এসে কিছু শোকের সঙ্গি হচ্ছি। জানি লিডারের এই শোক শুধু তার একার শোক নয়, এটা আমাদের সকলে শোক, এটা আমাদের গণতন্ত্র প্রিয় বাংলাদেশিদের শোক।

বাসায় দোয়া-দরূদে তারেক রহমান : মায়ের চলে যাওয়ার শোকে আচ্ছন্ন তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সারাটি সময় পার করেছেন দোয়া-দরূদ ও নামাজে। বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বুধবার রাতে এবং বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত বাসায় ম্যাডামের রুহের মাগফেরাত কামনায় ইবাদত বন্দেগীতে ছিলেন। দোয়া-দরূদ, কোরআন তেলাওয়াত করেছেন। আত্মীয়-স্বজনরা অনেকে বাসায় এসেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সান্ত¦না জানাতে। সেই সময়ে পারিবারিক পরিম-লে ম্যাডামের স্মৃতিময় ঘটনার কথা বলেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাদেরকে, আবেগ তাড়িত হয়েছেন, শোকাচ্ছন্ন হয়েছেন সেই সময় স্বজনরা সান্ত¦নাও দিয়েছেন তাকে। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে বাসা থেকে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আসেন।

গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শোকের ছায়া : সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল গুলশানের অফিসে কালো পতাকা উড়ছে। বিএনপির পতাকা এবং জাতীয় পতাকা অধনমিত করা হয়েছে। এখানে শোক বই খোলা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, রাজনীতিবিদরা দিনভর আসেন তাদের শোক জানাতে। গতকাল সমাজ কল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্যা এফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, ছারছীনা দরবার শরীফের পীর মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি, শ্রীলংকা হাইকমিশনার ও আগা খান ফাউন্ডেশন প্রতিনিধি, জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুর রহমানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ। গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা গেছে বাইরে নেতা-কর্মী ও গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড়। রাস্তার দুই ধারেই কর্মীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বনানী যুবদলের কর্মী আলতাফ হোসেন বলেন, নেত্রী নেই, মনটা ভালো নেই। কতদিন এই নেত্রীর দূর থেকে দেখে নিজে শক্তি সঞ্চয় করেছি, শত নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যে আশা দেখেছি সেই নেত্রী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন এই শোক কীভাবে কাটাব জানি না।

কষক দলের সহ-সভাপতি ভিপি ইব্রাহিম বলেন, ম্যাডামের চলে যাওয়াটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই আল্লাহর হুকুম। তবে একটা ঠিক বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের ম্যাডামের জনপ্রিয়তার রেকর্ড কেউ ভঙ্গ করতে পারবে না। তিনি চলে গেছেন ঠিকই তবে তিনি আমাদের মনের ভেতরে থাকবেন চিরঞ্জীব হয়ে সবসময় প্রতিক্ষণে।

গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বুধবার মানিক মিয়া এভিনিউতে তার নামাজে জানাজার পর দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ