শুক্রবার | ২৭ মার্চ, ২০২৬ | ১৩ চৈত্র, ১৪৩২ | ৭ শাওয়াল, ১৪৪৭

এলিয়েন প্রত্নতত্ত্বের ‘জনক’-এর দাবি

পিরামিড মানুষের হাতে তৈরি নয়, প্রমাণও আছে

যোগাযোগ ডেস্ক

পিরামিড মানুষের হাতে তৈরি হয়নি। এই বিশ্বাসটি কয়েক দশক ধরে ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসী’দের কৌতূহল জাগিয়ে রেখেছে। এই ধারণাটিকে সবচেয়ে জোরালো ও ধারাবাহিকভাবে প্রচার করেন সুইস লেখক এরিখ ফন ড্যানিকেন। তাকে প্রায়ই ‘প্রাচীন এলিয়েন প্রত্নতত্ত্বের জনক’ বলা হয়। এ খবর দিয়ে অনলাইন ডেইলি মেইল লিখেছে, ৯০ বছর বয়সে এ মাসে মারা যান ড্যানিকেন। তার আগে দাবি করেন, ভিনগ্রহের প্রাণীরা সরাসরি প্রাচীন মিশরীয়দের সাহায্য করেছিল এমন সব স্থাপনা নির্মাণে। এসব স্থাপনা মানুষের পক্ষে একা নির্মাণ করা অসম্ভব ছিল। তার ১৯৬৮ সালের বহুল আলোচিত বই ‘চ্যারিয়টস অব দ্য গডস’-এ তিনি লিখেছেন, এলিয়েন ‘মহাকাশচারীরা’ প্রাচীন মিশরীয় ও মায়ানসহ বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার কাছে এসেছিল এবং তাদের উন্নত প্রযুক্তির জ্ঞান দিয়েছিল। প্রমাণ হিসেবে ড্যানিকেন তুলে ধরেন- পিরামিডের নিখুঁত প্রকৌশল, নির্মাণপ্রক্রিয়া নিয়ে অমীমাংসিত প্রশ্ন, বিস্ময়কর গাণিতিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সামঞ্জস্য এবং প্রাচীন খোদাইচিত্রে দেখা তথাকথিত ‘অতিথি সত্তা’র ছবি। তার যুক্তি, গ্রেট পিরামিডের প্রকৌশল নিখুঁত বিষয় শুধুমাত্র মানব দক্ষতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি প্রশ্ন তোলেন- এত বিশাল পাথরের ব্লক কীভাবে সরানো হলো, ভেতরে আলো জ্বালানো হতো কীভাবে, আর নির্মাতারা কীভাবে গণিত, পৃথিবী ও মহাকাশ সম্পর্কে এত উন্নত জ্ঞান রাখতেন?

এই সব রহস্য একত্রে প্রমাণ করে- পিরামিড কেবল মানুষের হাতে তৈরি হয়নি, এমনটাই তার দাবি।
তবে তার জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদরা বারবার এসব দাবি খণ্ডন করেছেন। গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে দেখা যায়- প্রাচীন মিশরে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কাজ করতেন। কীভাবে তাদের খাবার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হতো, তার লিখিত নথি রয়েছে। এমনকি তাদের কবরস্থানও পাওয়া গেছে। পিরামিডের কাছাকাছি পুরো শ্রমিক শহরের ধ্বংসাবশেষ এবং পাথর কাটার খনি ও পরিবহনের চিহ্নও আবিষ্কৃত হয়েছে।

ড্যানিকেনকে ‘প্রাচীন এলিয়েন প্রত্নতত্ত্বের জনক’ বলা হয়। কারণ তার বইগুলোই এই ধারণাকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলে যে, ভিনগ্রহের প্রাণীরা মানব সভ্যতার বিকাশে প্রভাব ফেলেছে। তার বই ৩২টি ভাষায় ৬ কোটির বেশি কপি বিক্রি হয় এবং পিরামিড নির্মাণে ভিনগ্রহের সহায়তার ধারণাকে মূলধারায় নিয়ে আসে। সুইস এই লেখক ১০ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করলে তার বিতর্কিত তত্ত্বগুলো আবার আলোচনায় ফিরে আসে। পিরামিড এলিয়েনদের তৈরি- এই ধারণা জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও বহুবার এসেছে। এমনকি সম্প্রতি ইলন মাস্কও এটি সমর্থন করেন। ২০২০ সালের জুলাইয়ে তিনি তৎকালীন টুইটারে লিখেছেন- ‘এলিয়েন্স বিল্ট দ্য পিরামিডস অবভিয়াসলি’। অর্থাৎ স্পষ্টতই এলিয়েনরা পিরামিড বানিয়েছে।

ড্যানিকেনের কাজের ভিত্তি ছিল আরও পুরোনো কিছু তত্ত্ব, যেমন লেখক ইগনেশিয়াস এল. ডনেলির দাবি, পিরামিড নাকি হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা আটলান্টিস-এর বেঁচে যাওয়া মানুষরা তৈরি করেছিল। চ্যারিয়টস অব দ্য গডস-এ ড্যানিকেন লিখেছেন, এলিয়েন সত্তারা মিশরের ফেরাউনদের ‘দ্বিতীয় জীবন’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তার মতে, এই কারণেই শাসকদের মমি করে সম্পদসহ কবর দেয়া হতো- যাতে তারা পুনরুজ্জীবিত হলে সেগুলো ব্যবহার করতে পারে। তার তত্ত্ব অনুযায়ী, এই দেবতাসদৃশ অতিথিরা একদিন নক্ষত্রলোক থেকে ফিরে এসে সংরক্ষিত দেহগুলোকে আবার জাগিয়ে তুলবে।

গ্রেট পিরামিড সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘প্রায় ৪৯০ ফুট উঁচু এবং ৩কোটি ১২ লাখ টন ওজনের একটি কৃত্রিম পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে সেখানে- এক অবিশ্বাস্য কীর্তি। আর বলা হয়, এটা নাকি শুধু এক বিলাসী রাজার সমাধি! যে এই ব্যাখ্যা বিশ্বাস করতে পারে, সে করুক…’। তিনি আরও দাবি করেন, প্রাচীন অঙ্কন ও উপকথায় বলা হয়েছে- ‘দেবতারা’ নক্ষত্র থেকে ফিরে এসে সংরক্ষিত দেহগুলোকে নতুন জীবনে ফিরিয়ে দেবে। তার মতে, মিশরীয় খোদাইচিত্রে এসব ‘অতিথি’র উপস্থিতির ইঙ্গিত রয়েছে।

যদিও ড্যানিকেনের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ ছিল না, তবু তিনি মিশর ও লাতিন আমেরিকা ভ্রমণ করেন এবং বই, বক্তৃতা ও ভিডিওর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তার তত্ত্ব ছড়িয়ে দেন। তিনি বারবার বলেন, পিরামিড নির্মাণের জন্য যে প্রযুক্তি দরকার ছিল, তা প্রাচীন মিশরে ছিল না। তার ভাষায়, পিরামিড নির্মাতাদের প্রযুক্তি নিয়ে বহু সমস্যা রয়েছে, কিন্তু সমাধান খুব কম। তিনি দাবি করেন, পাথর গড়ানোর জন্য কাঠের রোলার ব্যবহার করলে যে পরিমাণ কাঠ লাগত, তা তখনকার মিশরে পাওয়া যেত না।

তিনি আরও বলেন, গ্রেট পিরামিডের ভেতরে শ্রমিক বা টর্চের কোনো প্রমাণ নেই- যা তার মতে প্রমাণ করে, স্থাপনাটি এমন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান প্রতিফলিত করে যা প্রাচীন মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। তিনি প্রশ্ন তোলেন- ‘খিওপসের পিরামিডের উচ্চতা ১০০ কোটি দিয়ে গুণ করলে সূর্য ও পৃথিবীর দূরত্বের কাছাকাছি আসে- এটা কি কাকতালীয়?’ তিনি আরও প্রশ্ন করেন- পিরামিড দিয়ে যাওয়া একটি মধ্যরেখা কীভাবে মহাদেশ ও মহাসাগরকে সমান দুই ভাগে ভাগ করে, পিরামিডের মাত্রায় ‘পাই’ ধ্রুবকের উপস্থিতি কি কাকতালীয়, এমনকি পৃথিবীর ওজনের হিসাবও নাকি এতে নিহিত! ড্যানিকেন পরে আরও ২৫টি বই লেখেন প্রাচীন এলিয়েন তত্ত্ব নিয়ে। অ্যানসিয়েন্ট এলিয়েন্সের মতো টিভি অনুষ্ঠান তার ধারণাকে আরও বিস্তৃত দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। এলিয়েন এনকাউন্টার নিয়ে লেখক নাইজেল ওয়াটসন বলেন, ড্যানিকেনের সাফল্যের ভিত্তি ছিল প্রমাণ নয়, বরং বিশ্বাস। সূত্র : মানবজমিন

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ