বাংলাদেশে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি দিয়ে যেসব ইশতেহার ঘোষণা করেছে সেগুলো নিয়ে নানা রকম আলোচনা ও বিশ্লেষণ হচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। প্রশ্ন উঠছে, এসব ইশতেহার থেকে আসলে দেশের মানুষ কী বার্তা পাচ্ছে? কিংবা নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোই বা তাদের ইশতেহারের মাধ্যমে মানুষকে সামনের দিনগুলোর জন্য কী ধরনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে?
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ ছোট-বড় বিভিন্ন দল ভোটারদের কাছে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরতে ইতিমধ্যেই ইশতেহার বা ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচনকে সামনে রেখে মূলত বিএনপি ও তার পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যেই বেশি তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইশতেহারগুলোয় কিছু নতুন বক্তব্য দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টার বহিঃপ্রকাশ যেমন ঘটেছে, তেমনি আবার অনেক কিছুই আছে, যা দীর্ঘকাল ধরেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির তালিকায় ছিল, যা দলগুলো ক্ষমতায় থেকেও বাস্তবায়ন করেনি। তাদের মতে, দলগুলো তাদের অনেক প্রতিশ্রুতিই কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট কর্মপন্থা উল্লেখ করেনি। তবে প্রায় সব দলের ইশতেহারেই দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে সাংবিধানিক সংস্কার গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করেন তারা। এই সাংবিধানিক সংস্কারের কয়েকটি প্রশ্নেই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে সংসদ নির্বাচনের সাথেই।
বিএনপির ইশতেহার কী বলছে
এবারই প্রথমবারের মতো নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া তারেক রহমানের নেতৃত্বেই এবার দলটির নির্বাচনী তৎপরতা চলছে।
শুক্রবার ঘোষিত দলটির ইশতেহারে দেশের প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষক কার্ড ও কৃষি বীমা, এক লাখ স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা, শিক্ষাক্ষেত্রে ‘মিড ডে মিল’ বা দুপুরের খাবার, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস এবং বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যের কথা জানানো হয়েছে। মোট ৫১টি বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেছেন, ‘কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা যাবে না, যদি না দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জবাবদিহির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দেওয়া যায়।’
এই ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রদান, জুলাই হত্যার বিচার এবং গণ-অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষাসহ আরো অনেক বিষয়কে স্থান দিয়েছে বিএনপি।
এ ছাড়া আরো যা আছে তার মধ্যে আছে, পাঁচ লাখ সরকারি শূন্য পদে কর্মচারী নিয়োগ, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়ন করা, পেনশন ফান্ড গঠন ও বেকারভাতা চালু, আইটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
প্রসঙ্গত, বিএনপির ইশতেহারের কিছু বিষয় ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারেও ছিল। অবশ্য বিএনপি নিজেও বলেছে, বিভিন্ন সময়ের পরিকল্পনার ধারাবাহিকতাতেই এবারের ইশতেহার তৈরি করেছে তারা।
আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, ‘ইশতেহারের কিছু বিষয়ের মধ্যে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টার প্রতিফলন আছে এবং সেটাই রাজনৈতিক দলের জন্য স্বাভাবিক।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতসহ সবাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে, রাষ্ট্র সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে।
কিন্তু এগুলো কিভাবে হবে তার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা কিংবা নির্দেশনা নেই। দলগুলোর উচিত, এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করা।’
জামায়াতের ইশতেহারে কী গুরুত্ব পেল
ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনেরও ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ২০০৮ সালের পর এবারই প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার দিল দলটি। আদালতের রায়ে ২০১৩ সালে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল। শেখ হাসিনার সরকারের পর তারা আবার নিবন্ধন ফেরত পায়।
ইশতেহারে জামায়াত জানিয়েছে, আগামীতে সরকার ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনায় ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ইশতেহারে আলাদা করে ৪১ দফা প্রতিশ্রুতির কথাও তুলে ধরেছে দলটি।
তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় চার নম্বরে রাখা হয়েছে, নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন। যদিও দলটির নারী ইস্যুতে বিভিন্ন মন্তব্য সাম্প্রতিক সময়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়েদের সম্মতি সাপেক্ষে কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা তিন ঘণ্টা কমানোর বিষয়টি ইশতেহারে রেখেছে দলটি।
ইশতেহারে দলটি বলেছে, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। আর এর বিপরীতে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করবে।
‘সাত কোটি কর্মক্ষম যুবকের জন্য দুই ভাগে কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে এবং সেটি দেশে ও দেশের বাইরে দুই জায়গাতেই করা হবে’—এমন প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, ‘জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো নারী ইস্যুতে ইশতেহারে যা বলেছে তা কতটা বিশ্বাস করে, সেই প্রশ্ন আছে তাদের অতীত বক্তব্য ও অবস্থানের কারণেই।’
তিনি বলেন, ‘বরং তাদের ধর্মকে ব্যবহারের কারণে মানুষের মৌলিক ও সমঅধিকার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কর্তৃত্ববাদের পর একটি গোষ্ঠী ক্ষমতায়িত হয়েছে যারা নারীর ক্ষমতায়নের বিরোধী।’
দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলছেন, ‘ধর্মভিত্তিক কিছু দল নারী ইস্যুতে যে অবস্থান নিয়েছে সেটি মেনে নেওয়ার জন্য দেশের মানুষ প্রস্তুত নয় বলে তিনি মনে করেন। তবে জামায়াতে ইসলামী কট্টরপন্থার পরিবর্তে তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর যে চেষ্টা করছে, সেটি তাদের ইশতেহারে উঠে এসেছে’ বলে মনে করেন তিনি।
এনসিপির ইশতেহারে কী আছে
বাংলাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি তাদের দলের ৩৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। যদিও নতুন এই দলটি জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধে অংশ নিচ্ছে সংসদ নির্বাচনে। তারা তাদের ইশতেহারে যেসব বিষয় উল্লেখ করেছে, তাতে শুরুতেই আছে জুলাই সনদের প্রসঙ্গ। পাশাপাশি, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এবং আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের শাসনামলে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ড ও গুমের বিচারের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
এ ছাড়া ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করা, আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, চাঁদাবাজি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা, মেধাবীদের দেশে ফেরানোসহ মোট ১২টি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ৩৬ দফার ইশতেহারে। সেখানে তারা আরো বলেছে- সংসদে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া পূর্ণ বেতনে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ও এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক, সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক পিরিয়ড লিভ ও ডে-কেয়ার সুবিধা থাকার কথা প্রতিশ্রুতিতে রাখা হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের ইশতেহার
চরমোনাই পীর হিসেবে পরিচিত সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন তাদের ঘোষিত ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বত্র শরিয়ার প্রাধান্যসহ মৌলিক ৩০ দফা প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছে। এতে তারা নারী, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারসহ সব জনগোষ্ঠীর মৌলিক ও মানবাধিকারের সুরক্ষার কথা বলেছে। পাশাপাশি তাদের ইশতেহারে জনমতের যথার্থ প্রতিফলন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পিআর (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
দলটি তাদের মৌলিক ইশতেহারের বাইরে ১২টি বিশেষ কর্মসূচি, আট দফা নীতিগত অবস্থান, রাষ্ট্র সংস্কারে ছয় দফা পরিকল্পনা এবং খাতভিত্তিক ২৮টি উন্নয়ন পরিকল্পনাও তুলে ধরেছে ।
বিশ্লেষকরা যা বলছেন
সার্বিকভাবে দলগুলোর এবারের ইশতেহার থেকে মানুষ কী বার্তা পেয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, কর্তৃত্ববাদের পতন পরবর্তী পরিস্থিতিতে দলগুলো জানে জনঅসন্তোষ তৈরি হলে মানুষ রুখে দাঁড়ায় এবং সে কারণেই ভোটারদের প্রত্যাশাকে বিবেচনায় নিয়ে অনেক অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কৌশলগত কোনো কর্মপরিকল্পনা ইশতেহারগুলোতে দেখছি না। আশা করি দলগুলো এসব বিষয়ে কীভাবে তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন তার সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা প্রকাশ করবে। আরেকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলছেন, বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে ইশতেহার ঘোষণার সংস্কৃতি যেমন আছে তেমনি নির্বাচনে পর দলগুলোর আর সেই ইশতেহার অনুযায়ী কাজ না করার চর্চাও আছে। এবারেও সব দলের ইশতেহারেই অনেক চমকপ্রদ কথা আছে। নতুন ও পুরনো অনেক প্রতিশ্রুতির সমাহার আছে। কিন্তু সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, অর্থের সংস্থান কোথা থেকে হবে এবং এগুলো বাস্তবায়নের জন্য সততা ও দক্ষতা আছে কি না, এসব প্রশ্ন আছে। -কালের কষ্ঠ










