শনিবার | ২৮ মার্চ, ২০২৬ | ১৪ চৈত্র, ১৪৩২ | ৮ শাওয়াল, ১৪৪৭

ব্যবসা-বাণিজ্যে দুরবস্থা

অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য রীতিমতো খাদের কিনারে। আগের মন্দা ও খারাপ পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়ইনি, বরং আরো খারাপ হয়েছে। মূল্যস্ফীতি এখনো অসহনীয়। উচ্চ সুদের হার, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ভোক্তার চাহিদায় ধস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানি কম, জ্বালানিসংকট—সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য আর বিনিয়োগের পায়ে পায়ে সংকট।দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদায়ি বছরটি ছিল কেবল টিকে থাকার লড়াই। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে অর্থনীতির এই গুমোট ভাব কাটবে—এমন প্রত্যাশায় বুক বাঁধছেন তাঁরা।

ব্যবসায়ীদের মতে, গত এক বছরে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। কিন্তু সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় পণ্যের বিক্রি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।তারা বলছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাইরেও বেসরকারি খাতে নানা কাঠামোগত সমস্যায় তারা জর্জরিত। উচ্চ সুদহার ও কঠোর ঋণনীতির কারণে বিনিয়োগ ব্যয় বেড়েছে, বিশেষ করে এসএমই ও নতুন উদ্যোক্তারা অর্থায়নে বড় বাধার মুখে পড়ছেন। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, তারল্যসংকট এবং দুর্বল সুশাসন ব্যাবসায়িক আস্থা নষ্ট করছে। অন্যদিকে বন্দরের অদক্ষতা ও লজিস্টিক ব্যয় প্রতিযোগিতা কমাচ্ছে, আর দক্ষ জনবল ঘাটতি ও প্রযুক্তি বিনিয়োগের ধীরগতি বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীলতাকে দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

দেশের অর্থনীতি সংকটময় পরিস্থিতি পার করছে, তা উঠে এসেছে সরকারের পর্যবেক্ষণেও। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দি ইকোনমি ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে গেছে, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে ধীরগতি দেখা দিয়েছে, সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন উদ্যোগ নিতে নিরুৎসাহ হচ্ছেন। ফলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ২ শতাংশে।রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বাজারে স্থবিরতার প্রভাব সরাসরি পড়ে শিল্প ও সেবা খাতে। একই সময় কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ০.৭৬ শতাংশ, শিল্পে ২.৪৪ শতাংশ ও সেবায় ২.৪১ শতাংশ।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ নিলেও মূল সমস্যা এখন বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া।

প্রতিবেদন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ঝুড়ির চেয়ে নেতিবাচক ঝুড়ি বেশি ভারী। একদিকে অর্থনীতির সংগ্রাম চলছে, অন্যদিকে জীবিকার সংগ্রামও চলছে। তবে এর চেয়েও পরিস্থিতি খারাপ হতে পারত। গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সরকারের সদিচ্ছা স্পষ্ট, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত।’

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত নিশ্চয়তার অভাব। ব্যাংকঋণের সুদ এখন ১৪-১৬ শতাংশের ঘরে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘গলার কাঁটা’। ডলারের দাম ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় স্থির হলেও বাজারে ডলারের অপ্রতুলতা কাটেনি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক এলাকায় নতুন নামে চাঁদাবাজি ও শ্রমিক অসন্তোষ শিল্পাঞ্চলগুলোকে অস্থির করে তুলেছে।

মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রিতে বড় ধস নেমেছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কারখানার উৎপাদন লাইনে। একদিকে অবিক্রীত পণ্যের মজুদ বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে কারখানাগুলো তাদের সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না। অনেক শিল্পোদ্যোক্তা বাধ্য হয়ে কারখানার শিফট কমিয়ে দিয়েছেন, এমনকি উৎপাদন খরচ পোষাতে না পেরে কোনো কোনো ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক শিল্প খাতের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ