রবিবার | ১২ এপ্রিল, ২০২৬ | ২৯ চৈত্র, ১৪৩২ | ২৩ শাওয়াল, ১৪৪৭

মিয়ানমারের গুলিতে কাঁপছে সীমান্ত, রাত হলেই টেকনাফে আতঙ্ক

যোগাযোগ ডেস্ক

‘রাত হলেই আতঙ্ক বেড়ে যায়। শিশুদের বাইরে বের হতে দিতেও ভয় লাগে। সীমান্তে স্থায়ী শান্তি না এলে আমাদের এই ভয়ের জীবন শেষ হবে না।’

এভাবেই আতঙ্কের কথা জানাচ্ছিলেন মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম। শুধু তিনি নয়, তার মতো অনেকেই চরম আতঙ্কে রয়েছেন। রাত হলে স্থানীয়দের মধ্যে উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সীমান্তে গোলাগুলির শব্দ না শোনা গেলেও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোববার (১১ জানুয়ারি) মিয়ানমারের রাখাইন থেকে ছোড়া গুলিতে শিশু হুজাইফা সুলতানা আফনানের মাথায় গুলি লাগে। তাকে গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সোমবার (১২ জানুয়ারি) হোয়াইক্যং লম্বাবিল সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে এক যুবকের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এসব ঘটনার প্রতিবাদে গত দুদিন ধরে টেকনাফের হোয়াইক্যংসহ আশপাশের এলাকায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিল করছেন স্থানীয়রা।

গুলিবিদ্ধ শিশু হুজাইফা সুলতানার চাচা আলী আকবর বলেন, ‘আমার ভাতিজির কোনো অপরাধ ছিল না। সীমান্তের সংঘাতের শিকার হয়ে সে আজ জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। আমরা চাই, সীমান্ত এলাকায় যেন আর কোনো নিরীহ শিশু এভাবে গুলিবিদ্ধ না হয়।’

রোববার সকালের দিকে মিয়ানমার দিক থেকে ছোড়া গুলি এসে লাগে শিশু হুজাইফা সুলতানা মাথায়। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। তার অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে ঢাকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রস্তুতি চলছে।

মাইন বিস্ফোরণে পা বিচ্ছিন্ন যুবক মোহাম্মদ হানিফের বাবা ফজলুল হক বলেন, ‘গতকাল সকালে মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি হোয়াইক্যং লম্বাবিল সীমান্তে এলাকায় মাটির নিচে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে আমার ছেলে গুরুতর আহত হয়। বিস্ফোরণে তার ডান পায়ের গোড়ালি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বাম পায়েও সে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। বর্তমানে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় চলাচল করাই এখন জীবনের ঝুঁকি। কোথায় কোথায় মাইন পুঁতে রাখা আছে, তাতো আমরা জানি না।’

হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সংঘাতের প্রভাব সরাসরি টেকনাফ সীমান্তে এসে পড়ছে। কয়েকদিন ধরে সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির শব্দ না থাকলেও বিস্ফোরণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে।’

সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সাইফুল ইসলাম টুটুল বলেন, ‘আমাদের দাবি সীমান্তে অবিলম্বে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। পুঁতে রাখা মাইন অপসারণ করতে হবে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে সীমান্ত এলাকায় সাধারণ মানুষ বারবার সহিংসতার শিকার হচ্ছে।’

হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল বলেন, ‘গত ৪-৫ দিন ধরে হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাখাইনে গোলাগুলি ও অস্থিরতার কারণে এপারের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এখনো সীমান্তের কাছাকাছি বেড়িবাঁধ সংলগ্ন চিংড়ি ঘেরে যেতে স্থানীয়রা ভয় পাচ্ছেন।’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ শিশু হুজাইফা সুলতানা ও মাইন বিস্ফোরণে আহত যুবকের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তায় দেওয়া হবে। আশা করি বুধবার (১৪ জানুয়ারি) তাদের পরিবারের কাছে চেক হস্তান্তর করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব বিষয়ে আতঙ্কিত না হতে প্রচার-প্রচারণা চালানোর জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। সীমান্তের বিষয়ে বিজিবির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ