শনিবার | ২৮ মার্চ, ২০২৬ | ১৪ চৈত্র, ১৪৩২ | ৮ শাওয়াল, ১৪৪৭

যুদ্ধ আর ট্রাম্পের হাতে নেই, হিসাব পাল্টে দিয়েছে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যকে এক দ্রুত অবনতিশীল সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর ক্রিস মারফি। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ সংঘাতের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন’।

সিনেটে ডেমোক্র্যাট সদস্য মারফি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে ধারাবাহিক পোস্টের মাধ্যমে এ সতর্কবার্তা দেন। তার মতে, এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে পুরো অঞ্চলকে সহিংসতার ঘূর্ণাবর্তে ফেলে দিয়েছে। মারফি লিখেছেন, এখন এটা পরিষ্কার যে ট্রাম্প এই যুদ্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। ইরানের পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা সম্পর্কে তিনি মারাত্মক ভুল ধারণা পোষণ করেছিলেন। পুরো অঞ্চল এখন জ্বলছে। তিনি আরও জানান, প্রথম সংকটটি দানা বেঁধেছে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে—যা একটি সংকীর্ণ নৌপথ এবং যেখান দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশেরও বেশি তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। মারফি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালির সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করার ক্ষেত্রে তেহরানের সক্ষমতাকে ওয়াশিংটন খাটো করে দেখেছে।

তিনি লিখেছেন, ট্রাম্প বিশ্বাস করেছিলেন যে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না। তিনি ভুল ছিলেন। আর এখন তেলের দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে।

সিনেটর জানান, ইরানের ড্রোন, স্পিডবোট ও সামুদ্রিক মাইন ব্যবহারের কারণে এই নৌপথ সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত কঠিন। তিনি আরও যোগ করেন যে এসব অস্ত্র ‘নির্মূল করা সম্ভব নয়। এগুলো সংখ্যায় অনেক বেশি, চারদিকে ছড়িয়ে আছে এবং লুকিয়ে রাখা হয়েছে।’

মারফি বলেন, এই প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া মার্কিন নৌবাহিনীকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

ট্রাম্প ভুল করেছেন

তিনি বলেন, দ্বিতীয় সংকটটি তৈরি হয়েছে আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা থেকে।

তিনি লিখেছেন, ইরান অনির্দিষ্টকালের জন্য এই অঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোতে আঘাত করতে পারে কারণ তাদের কাছে প্রচুর পরিমাণে সস্তা ও অস্ত্রসজ্জিত ড্রোন রয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে চালানো হামলাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে মারফি বলেন, এগুলো জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি উৎপাদন ব্যাহত করেছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ আগেই দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে ড্রোন আধুনিক সংঘাতের রূপ বদলে দিয়েছে।

ট্রাম্প যদি ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে সামান্যতম মনোযোগ দিতেন, তবে তিনি লক্ষ্য করতেন যে যুদ্ধকৌশল কতটা বদলে গেছে। কিন্তু তিনি তা করেননি। আর এখানেই তিনি বড় ভুলটি করেছেন।

একই সময়ে, পুরো অঞ্চল জুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে। যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইল ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে যে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবস্থা বা ইন্টারসেপ্টরের মজুদ ফুরিয়ে আসছে।

মারফি জানান, এই সংঘাত ভৌগোলিকভাবেও বিস্তৃত হচ্ছে।

একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে; লেবাননে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো ইসরাইলে আঘাত হানছে এবং ইরাকে থাকা গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ইসরাইল এখন লেবাননে বড় ধরনের স্থল অভিযানের হুমকি দিচ্ছে, যা নিজেই একটি নতুন সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তিনি সতর্ক করেন যে, শিগগিরই অন্যান্য ফ্রন্টগুলোতেও আগুন জ্বলে উঠতে পারে।

ট্রাম্পের কোনো শেষ পরিকল্পনা নেই

মারফি বলেন, এখন পর্যন্ত ইয়েমেনের হুতিরা তুলনামূলক শান্ত রয়েছে। সম্ভবত এটি বেশিদিন থাকবে না। তারা লোহিত সাগরে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে পারে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা গণহত্যা শুরুর পর থেকে এর প্রতিবাদে হুতিরা ওই রুটে নৌযান চলাচল অনেকটাই বন্ধ করে দিয়েছিল। মারফি বলেন, সিরিয়াও পুনরায় সহিংসতার কবলে পড়তে পারে। ‘সিরিয়ার জন্য, ট্রাম্পের ইরানে হামলা চালানোর এটিই সবচেয়ে খারাপ সময়। সিরিয়াও আবার বিস্ফোরিত হতে পারে।’ মারফি বলেন, শেষ সংকটটি হলো এই যুদ্ধ শেষ করার কোনো পরিকল্পনার অভাব।  তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের কোনো ‘এন্ডগেম’ নেই। ইরান এবং তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যেতে পারে। তিনি সতর্ক করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অভিযান ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে। হাজার হাজার আমেরিকানের মৃত্যুতে এটি ‘আর্মাগেডন’ (মহাপ্রলয়)-এ পরিণত হবে। মারফি আরও বলেন, জয় ঘোষণা করে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। ‘মিথ্যা বিজয় ঘোষণা করবেন? তাতে ক্ষমতায় থাকা ইরানের কট্টরপন্থীরা আমরা যা ধ্বংস করেছি তা আবার নতুন করে তৈরি করবে।’ সবশেষে তিনি প্রশাসনকে এই যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানান। ‘এর সবকিছুই পুরোপুরি অনুমানযোগ্য ছিল। সত্যি বলতে, এ কারণেই আগের প্রেসিডেন্টরা এ ধরনের যুদ্ধ শুরু করার মতো বোকামি করেননি।’

তিনি বলেন, ট্রাম্প যুদ্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। তার জন্য এখন সেরা পথ হলো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা এবং এটি শেষ করা। আরও বড় বিপর্যয় ঠেকানোর এটাই একমাত্র উপায়।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ