রবিবার | ২৯ মার্চ, ২০২৬ | ১৫ চৈত্র, ১৪৩২ | ৯ শাওয়াল, ১৪৪৭

রমজানে নারীই পরিবারে ইবাদতের নেপথ্য অগ্রসেনানী

ইসলাম ডেস্ক :

রমজান এলে ঘরের আবহ বদলে যায়। সাহরির শেষ প্রহরে আলো জ্বলে ওঠে, ইফতারের আগে ব্যস্ততা বাড়ে, কোরআনের সুরে সন্ধ্যা গভীর হয়। এই সামগ্রিক ইবাদত-পরিবেশের পেছনে যে মানুষটি নীরবে সবচেয়ে বেশি শ্রম দেন, তিনি ঘরের নারী—মা, স্ত্রী বা বোন। তিনি নিজে রোজা রাখেন, নামাজ পড়েন, কোরআন তিলাওয়াত করেন; একই সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করেন। ইসলামের আলোকে এই নীরব অবদান কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়; সঠিক নিয়তে তা উচ্চ মর্যাদার ইবাদত।

কোরআন মানুষকে সৎকর্মে পারস্পরিক সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছে: “তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো।” (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২) ইবন কাসির (রহ.) লিখেছেন, আল্লাহর আনুগত্য ও কল্যাণমূলক কাজে সহযোগিতা করা নিজেই নেক আমল (তাফসির ইবন কাসির)। রমজানে পরিবারের জন্য সাহরি প্রস্তুত করা, ইফতার আয়োজন করা, শিশুদের রোজা ও নামাজে উৎসাহ দেওয়া; এসবই তাকওয়ার কাজে সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইফতার করানোর ফজিলত স্পষ্ট করেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে; অথচ রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না।” (তিরমিজি, হাদিস: ৮০৭)

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, অল্প খাবার দিয়েও ইফতার করানো হলে এ ফজিলত প্রযোজ্য (আল-মাজমু‘)। পরিবারের একাধিক সদস্যের জন্য প্রতিদিন ইফতার প্রস্তুত করা—এ আমলের পরিধি তাই অনেক বিস্তৃত।

সাহরির গুরুত্ব সম্পর্কেও সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে: “তোমরা সাহরি খাও; কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।

” (বুখারি, হাদিস: ১৯২৩)ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) সাহরির বরকতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন—এটি রোজাদারকে ইবাদতে শক্তি জোগায় (ফাতহুল বারী)। যে নারী সাহরি প্রস্তুত করেন, তিনি পরোক্ষভাবে পরিবারের ইবাদতের শক্তি জোগাচ্ছেন। ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো—কাজের মূল্য নির্ভর করে নিয়তের ওপর। “নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” (বুখারি, হাদিস: ১)

শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন, মুমিনের স্বাভাবিক কাজও সৎ নিয়তের মাধ্যমে ইবাদতে রূপ নেয় (মাজমু‘ আল-ফাতাওয়া)।তাই রান্না, ঘর গোছানো, শিশুদের যত্ন—এসব কাজ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরিবারের ইবাদতে সহায়তার উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা সওয়াবের উৎস।

পরিবারে উত্তম আচরণ ও দায়িত্বশীলতা ইসলাম বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।” (তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫) হাদিসটির ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন, পরিবারের কল্যাণে শ্রম দেওয়া ও তাদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা ঈমানি চরিত্রের অংশ। রমজানে নারীর ভূমিকা এই ঈমানি চরিত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ধৈর্যের মূল্য সম্পর্কেও কোরআনের ঘোষণা স্পষ্ট: “নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে হিসাব ছাড়াই।” (সুরা আজ-জুমার: ১০) ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কষ্ট সহ্য করা ধৈর্যের অন্তর্ভুক্ত এবং তা মহান সওয়াবের কারণ (তাফসির আল-কুরতুবী)। দীর্ঘ সময় রোজা রেখে রান্নাঘরে কাজ করা, পরিবারের প্রয়োজন মেটানো—এ ধৈর্য নিঃসন্দেহে মূল্যবান।

রমজানে পরিবারের ইবাদত-পরিবেশ গড়ে তোলার নেপথ্যে যে নারী নীরবে শ্রম দেন, তার এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের উচিত কাজে সহযোগিতা করা, যাতে তিনিও ব্যক্তিগত ইবাদতের পর্যাপ্ত সুযোগ পান। ইসলাম পারস্পরিক সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়; একতরফা বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার নয়।

রমজানের প্রকৃত চেতনা কেবল ব্যক্তিগত সাধনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি পারিবারিক ও সামাজিক ইবাদতেরও নাম। সেই ইবাদতের নেপথ্যে যে নারী নীরবে সওয়াবের বীজ বপন করেন, তিনি সত্যিই নেপথ্য অগ্রসেনানী। তার প্রতিটি আন্তরিক শ্রম, প্রতিটি ধৈর্য, প্রতিটি নিয়ত—আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত। আর কুরআনের ভাষায়, আল্লাহ কারও আমল বিন্দুমাত্র নষ্ট করেন না (সুরা নিসা, আয়াত: ৪০)।

রমজানের এই উপলব্ধি আমাদের ঘরকে আরও কৃতজ্ঞ, ন্যায়ভিত্তিক ও ইবাদতমুখী করে তুলুক। আমীন।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ