ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সরকারের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান। বাবা-মায়ের পথ ধরে তিনিও হচ্ছেন রাষ্ট্রের কর্ণধার। সবকিছু ঠিক থাকলে দেশের নবম সংসদ নেতা হিসেবে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) শপথ নেবেন তিনি। এরই মধ্যে দলীয়ভাবে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কারা থাকবেন সে নিয়ে সিক্রেট তালিকাও ইতোমধ্যে তার গুডবুকে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়ার আগে অন্যান্য কাজের সঙ্গে সঙ্গে ভোটের মাঠের প্রধান প্রতিপক্ষের বাসায় গিয়ে সরাসরি দেখা করেছেন তারেক রহমান। গত দু’দিনে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাওয়া তিনটি রাজনৈতিক দল জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রধানের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। আতিথেয়তা নিয়েছেন। সবাইকে নিয়ে সম্প্রীতির রাষ্ট্র গঠনের আশ্বাস দিয়েছেন।
বিষয়টিকে দলগুলোর নেতারা রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সম্প্রীতির আভাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। রাজনৈতিক মতে ভিন্নতা থাকলেও অন্যান্য রাজনীতিবিদরাও বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তারা মনে করেন, এ ধরনের উদ্যোগ সব সময়ই থাকা উচিত। এতে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। অনেকে একে সম্প্রীতি ও উদারতার বার্তা হিসেবে দেখছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “যাদের সঙ্গে তারেক রহমান দেখা করেছেন, আমরা পছন্দ করি আর না করি তারা সংসদে যাচ্ছেন। তবে, দেশের প্রশ্নে সবার মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ করা দরকার। আমরা তারেক রহমানের এ উদ্যোগকে ভিন্নভাবে দেখছি না। এটা অবশ্য ভালো দিক।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাইবো ১৯৯০ ও ২৪ এ যেভাবে গণতন্ত্রমুক্ত হয়েছে, আগামীতে যেন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কোনও ব্যত্যয় না ঘটে। সর্বত্রই যেন গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘটে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও মব সন্ত্রাস দেখতে চাই না। আশা করি, সরকার ও বিরোধী দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।”
দু’দিনে তিন দলের প্রধানের বাসায় গেলেন, গ্রহণ করলেন আতিথেয়তা
নির্বাচনে সরকার গঠন করার মতো নিরঙ্কুশ আসন লাভের তৃতীয় দিনে অর্থাৎ গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করেন তারেক রহমান। সেখান থেকে গুলশান কার্যালয়ে যাওয়ার পরই দলীয়ভাবে জানানো হয় তিনি জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তার এই অভিপ্রায়কে স্বাগত জানান দলগুলোর হাইকমান্ড। এর পরদিনই সন্ধ্যা ৭টায় প্রথমে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াত আমিরের বাসভবনে যান বিএনপি চেয়ারম্যান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দলের দুই শীর্ষ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও নজরুল ইসলাম খান।
জামায়াতের আমির ছাড়াও দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ফুল দিয়ে বরণ করেন। এ সময় তাদেরকে আপ্যায়ন করেন জামায়াতের আমির। কিছুক্ষণ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে কথা বলেন তারা। পরবর্তীতে জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, তারেক রহমান বিরোধী দলকে সত্যিকার অর্থে মর্যাদা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তাই তারও গঠনমূলক ভূমিকা রাখবেন।
একইদিন রাত সাড়ে ৮টায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বেইলি রোডের বাসায় যান তারেক রহমানসহ বিএনপির প্রতিনিধি দল। সেখানে পৌঁছলে তাদেরকে ফুল দিয়ে বরণ করেন নাহিদ। এ সময় তারেক রহমানকে শাপলা কলির কাঠামো উপহার দেন তিনি। সেখানেও দু’পক্ষ ইতিবাচক রাজনীতির ইঙ্গিত দেন।
সর্বশেষ, ১৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সিদ্ধেশ্বরীর বাসভবনে যান তারেক রহমান। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তিনি সেখানে পৌঁছালে তাকে অভিবাদন ও ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান চরমোনাই পীর। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম ও মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ। আর বিএনপির পক্ষে ছিলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
সেখানে চরমোনাই পীরের আতিথেয়তা গ্রহণ করেন তারেক রহমানসহ শীর্ষ নেতারা। তাদেরকে বি়ভিন্ন উপহার সামগ্রীও দেওয়া হয় ইসলামি আন্দোলনের পক্ষ থেকে। সেখানে উভয় দলের নেতারা আগামীতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার আশ্বাস দেন।
কীভাবে দেখছেন রাজনীতিবিদরা
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়ার আগে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তারেক রহমানের এমন সাক্ষাৎকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেকে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এমন বৈঠককে আশা জাগানিয়া মনে করছেন কেউ কেউ। মতভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বার্থে সবাইকে উদার দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে হবে বলে মনে করেন তারা।
রবিবার নাহিদ ইসলামের বাসা থেকে তারেক রহমানের বিদায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “রাজনৈতিক মতভিন্নতা সত্ত্বেও কীভাবে এর বাইরে গিয়ে একত্রে দেশের জন্য কাজ করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মাধ্যমে তারেক রহমান যে রাজনৈতিক সৌজন্যতাবোধ দেখিয়েছেন আমরা সেটিকে সাধুবাদ জানাই।”
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি মনে করি, দায়িত্বগ্রহণের আগে তারেক রহমানের এ ধরনের উদ্যোগ নতুন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। কারণ রাজনৈতিক বিভাজন থাকবেই, বৈরিতাও থাকবে। অতীতে বিরোধী দল নামে জাহান্নাম বা দোজখ এই সংস্কৃতি থেকে উত্তরণ হওয়া জরুরি। বিরোধী দলের সঙ্গে তারেক রহমানের উদার দৃষ্টিভঙ্গি শেষ পর্যন্তও বিদ্যমান থাকলে দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা অক্ষুন্ন থাকবে।”
একই ধরনের কথা বলেন খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “তারেক রহমানের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে আগামীতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব কমবে, যা দেশের জন্য জরুরি। সরকার ও বিরোধী দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে। আর ফ্যাসিবাদের বিলোপ ও দুর্নীতির মূলোৎপাটনে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”










