বৃহস্পতিবার | ২ এপ্রিল, ২০২৬ | ১৯ চৈত্র, ১৪৩২ | ১৩ শাওয়াল, ১৪৪৭

প্রকাশ্যে হামলা • ব্যবসায়ীদের আলটিমেটাম • দুইজন গ্রেফতার

শাহজাদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব: চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ী-ছেলেকে কুপিয়ে জখম, আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা।

শাহজাদপুর- সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি ।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর—যা ঐতিহ্যগতভাবে তাঁতশিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সুপরিচিত এবং রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য একটি শান্ত জনপদ—সেখানে হঠাৎ করেই কিশোর গ্যাংয়ের সহিংস তৎপরতায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে জনাকীর্ণ হাটে ব্যবসায়ী ও তাঁর ছেলের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

বুধবার দুপুরে শাহজাদপুর কাপড়ের হাটে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী মানিক ও তাঁর ছেলে অন্তরের ওপর ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি সংঘবদ্ধ কিশোর দল ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয় তাদের। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ ঘটনায় বাজারজুড়ে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তাহীনতায় ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে বিক্ষোভে নামেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জড়িতদের গ্রেফতারের আলটিমেটাম দেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হামলার সঙ্গে জড়িতরা পার্শ্ববর্তী দ্বাবরিয়া গ্রামের একটি গোঁয়ার টাইপের পরিবারের সদস্য।দীর্ঘদিন ধরে ওই পরিবার এলাকায় দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, অভিযুক্তরা নতুন কোনো অপরাধী নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। “তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তারা করেনি”—এমন মন্তব্যও শোনা যায় এলাকাবাসীর মুখে।

অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের সদস্যরা বিগত জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত ছিল। প্রথমদিকে তারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মিজানুর রহমানের পক্ষে কাজ করে। পরবর্তীতে তারা এনসিপি প্রার্থী সাইফ মোস্তাফিজের পক্ষে সরাসরি প্রচারণায় অংশ নেয়।
সচেতন মহলের মতে, শাহজাদপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কেন্দ্রে কিশোর গ্যাংয়ের এমন দুঃসাহসিক তৎপরতা হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পরোক্ষ মদদ রয়েছে। উল্লেখ্য শাহজাদপুর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মিজানুর রহমান এই গ্রামের বাসিন্দা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত পরিবারের এক সদস্যকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে(এই লোক পরবর্তীতে আওয়ামী আমলে বিতর্কিত ভাবে পৌর কমিশনারের পদও বাগিয়েছিল) ।স্বাধীনতার পরপরই হযরত আলী নামে এক ব্যক্তির সন্দেহজনক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার নাম জড়িয়েছিল বলে দাবি করেন এলাকাবাসী। যা নিয়ে সে সময় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।আজকের এই নারকীয় ঘটনায়ও আবুল বাশার চেনি (৫৫) নামের যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সেও এই পরিবারের ।
গ্রেফতারকৃত আরকেজন জালাল উদ্দির সরকার (৪৩)। সিসি টিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের আটকের চেষ্টা চলছে বলে শাহজাদপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে।

শিক্ষার অভাব ও সামাজিক অবক্ষয়কেও এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
ঘটনার পর শাহজাদপুর থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে জড়িত দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”

এদিকে, স্থানীয়দের অভিযোগ—কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল এই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টাও চলছে বলে তারা দাবি করেন।সোশাল মিডিয়ায়ও ফেইক আইডি ব‍্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে,বিশেষ করে “হ্রদয়ে শাহজাদপুর” নামক একটি নাম পরিচয় হীন আইডি থেকে অনবরত মিথ‍্যা প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে।এই আইডি একটি প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিনত হয়েছে।সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই ভুয়া আইডির বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিত।অনেকেই মনে করছেন শাহজাদপুরকে অশান্ত করতে সোশাল মিডিয়াকে কেউ কেউ হাতিয়ার হিসাবে ব‍্যবহার করছে।তাদেরকেও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা অত‍্যন্ত জরুরী।

এ ঘটনায় শাহজাদপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে ।এবং কিশোর গ্যাংয়ের পেছনের ‘গডফাদারদের’ও আইনের আওতায় আনতে হবে।
ঘটনার পরপরই শাহজাদপুর বনিক সমিতির সভাপতি ইমদাদুল হক নওশাদ জরুরী সাংবাদিক সম্মেলন করে এই নারকীয় ও অমানবিক ঘটনার তীব্র নিন্দা প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে জড়িতদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান।পাশাপাশি শাহজাদপুরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে যাতে ব‍্যবসায়ীরা ব‍্যবসা পরিচালনা করতে পারে সেজন‍্য তিনি তার সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব‍্যক্ত করেন ।

তাদের ভাষায়, “যে হাত সাধারণ ব্যবসায়ীর ওপর চাপাতি চালায়, সেই হাত কোনো রাজনৈতিক দলের ঢাল হতে পারে না।

শান্তিপূর্ণ ও ব্যবসাবান্ধব জনপদ হিসেবে পরিচিত শাহজাদপুরে এ ধরনের সহিংসতা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি অশনিসংকেত। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসনের কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপের পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের সম্মিলিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

শান্ত শাহজাদপুরকে অশান্ত করার অপচেষ্টা রুখে দিতে রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়কেই দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ