ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়ে রোগ-বালাইয়ের প্রকোপ। বড়দের তুলনায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল। প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় শিশুরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় শিশুদের বাড়তি যত্ন নেওয়া জরুরি।
যেসব রোগের প্রকোপ বাড়ে: শুষ্ক আবহাওয়ায় বাতাসে ভেসে বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে নানা রকম ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া। কীটপতঙ্গও গরম আবহাওয়ায় দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। গরম থেকে বাঁচতে ঠাণ্ডা পানি পান করা বা আইসক্রিম খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, দিনে একাধিকবার ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করে অনেকে।
► সাধারণ সর্দি, কাশি, জ্বর।
► নিউমোনিয়া।
► ইনফ্লুয়েঞ্জা।
► ডায়রিয়া।
► এলার্জি ও ত্বকের সমস্যা।
► এলার্জিক রাইনাইটিস ও অ্যাজমা।
► ডেঙ্গু/চিকুনগুনিয়া (বিশেষত বর্ষায়)।
► টনসিলে প্রদাহ বা টনসিলাইটিস।
ঝুঁকিতে যারা : নবজাতক ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। বয়স পাঁচ পেরোলেও কিছু শিশুর বারবার অসুস্থ হয়। জন্মের সময় ওজন কম থাকলে, পুষ্টিহীনতায় ভুগলে, টিকা অসম্পূর্ণ থাকলেও শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।
কখন হাসপাতালে যাওয়া জরুরি :
শিশুর যেসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে—
► দম নিতে কষ্ট হলে।
► দেহের ত্বক নীলচে হয়ে গেলে।
► উচ্চমাত্রার ও দীর্ঘস্থায়ী জ্বর হলে।
► খিঁচুনি হলে।
► বুক ডেবে গেলে।
► বারবার বমি হলে।
► অতিরিক্ত পানিশূন্যতা দেখা দিলে।
যেসব উপসর্গ দেখা দিলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিতে হবে—
► দুই ঘণ্টা বা তার বেশি সময় প্রস্রাব না হলে।
► ১০২ ডিগ্রি বা তার বেশি জ্বর।
► দ্রুত শ্বাস বা বুক ডেবে গেলে।
► তীব্র পানিশূন্যতা (চোখ বসে যাওয়া, পানি পানে অক্ষম, ত্বক টানলে ধীরে নামা)।
► অতিরিক্ত বমি হলে।
► শরীর নীল হয়ে গেলে।
প্রতিরোধ : রোগ প্রতিরোধে টিকা অত্যন্ত কার্যকর। জন্মের পর ইপিআই শিডিউল অনুযায়ী শিশুকে টিকা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সব টিকা সময়মতো নিতে হবে। একই সঙ্গে শিশু, অভিভাবক ও পরিচর্যাকারীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। বাসার চারপাশের পরিবেশও পরিষ্কার রাখা জরুরি। শিশুর পরিচর্যা করা বা খাওয়ানোর আগে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া যা করা জরুরি—
► ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো।
► পরবর্তী সময়ে ডিম, মাছ, মাংস, ডালসহ সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা।
► ভিটামিন সি ও এ সমৃদ্ধ খাবার (কমলা, পেয়ারা, গাজর, কুমড়া ও লালশাক) বেশি করে খাওয়ানো।
► প্রোবায়োটিক (যেমন—দই) খাওয়ালে অন্ত্রের সুস্থতা নিশ্চিত হয়।
বেশি হয় যেসব রোগ : ► সাধারণ সর্দিকাশি-জ্বর : নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ, হালকা জ্বর, কাশি ও গলা ব্যথা। সাধারণত তিন থেকে পাঁচ দিন জ্বর, ৭-১৪ দিন উপসর্গ থাকতে পারে।
► নিউমোনিয়া : শ্বাসকষ্ট, দ্রুত শ্বাস, বুক ডেবে যাওয়া, জ্বর ও ঘন কাশি।
► ইনফ্লুয়েঞ্জা : হঠাৎ উচ্চ জ্বর, মাথা ও শরীর ব্যথা, ক্লান্তি, কাশি ও গলা ব্যথা।
► ডায়রিয়া : পাতলা পায়খানা, বমি, দুর্বলতা ও পানিশূন্যতা।
► এলার্জি/ত্বকের সমস্যা : র্যাশ, চুলকানি ও লাল দাগ।
► এলার্জিক রাইনাইটিস : নাক চুলকানো, পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া ও নাক বন্ধ।
► অ্যাজমা : শ্বাসকষ্ট, দ্রুত শ্বাস, শোঁ শোঁ শব্দ এবং রাতে কাশি বাড়া।
► টনসিলাইটিস : গলা ব্যথা, জ্বর, ঢোক গিলতে কষ্ট এবং গলা ফুলে যাওয়া।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল বা ডায়রিয়ার ওষুধ ও স্যালাইন ছাড়া বাড়তি ওষুধ প্রয়োজন হয় না। ত্বকের সমস্যার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে ক্রিম বা ওয়েন্টমেন্ট ব্যবহার করতে হতে পারে।
চিকিৎসা : চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি শিশুর পরিচর্যায় কিছু নিয়ম মেনে চলা যেতে পারে—
► শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে দেওয়া।
► পর্যাপ্ত তরল পান করানো।
► জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল ওষুধ।
► নাক বন্ধ থাকলে ড্রপ ও স্টিম নেওয়া।
► প্রয়োজনে ইনহেলার /নেবুলাইজেশন করা।
► চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যাবে।
► মন্টেলুকাস্ট (Montelukast) অযথা ব্যবহার করা উচিত নয়। সব ধরনের সর্দিকাশিতে এটি প্রয়োজন হয় না এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।
অনেকে মনে করেন, ইনহেলার শুরু করলে আজীবন ব্যবহার করতে হয়। এ ধারণা সঠিক নয়। শিশুর সুস্থতায় ওষুধের চেয়ে পরিচর্যা ও সতর্কতা বেশি জরুরি। শিশুকে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা খাবার থেকে দূরে রাখলে, বাসার পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখলে এবং সময়মতো টিকা নিলে শিশুর সুস্থতা অনেকটাই নিশ্চিত করা সম্ভব। লেখক : কনসালট্যান্ট









