শনিবার | ২৮ মার্চ, ২০২৬ | ১৪ চৈত্র, ১৪৩২ | ৮ শাওয়াল, ১৪৪৭

৯ লাখ কোটি টাকার বাজেটের পথে বাংলাদেশ

যোগাযোগ রিপোর্ট

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের আকার যত বড়ই হোক না কেন, মূল প্রশ্ন হচ্ছে—এই বাজেট কতটা বাস্তবায়নযোগ্য এবং এটি সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট, রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যে নতুন বাজেটকে অনেকটাই ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে।

অর্থনীতির বাস্তবতা: মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের চাপ

গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি করেছে। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বাজারে অস্থিরতা দেখা গেছে।

অপরদিকে দেশের শ্রমবাজারেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে বেকারত্বের পাশাপাশি আংশিক বেকারত্বও বাড়ছে।

এই বাস্তবতায় আগামী বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তি দক্ষতা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানোর আলোচনা রয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা গেলে একদিকে দেশে শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান বাড়বে, অপরদিকে বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়ে রেমিট্যান্স আয়ও বাড়তে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হতে যাচ্ছে। এমন এক সময়ে এই বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে, যখন দেশের অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি শক্ত করা জরুরি।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের ধীরগতি, বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, নিম্ন বিনিয়োগ এবং সীমিত কর্মসংস্থানের মতো নানা সমস্যার সম্মুখীন। এর পাশাপাশি আর্থিক খাতের অস্থিরতা এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি অর্থনীতির জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে আগামী সময়ে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের বিষয়টিও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতসহ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

তিনি আরও বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় দরিদ্র, প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি বাড়াতে কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, নতুন সরকারের জন্য এই বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সূচনা করতে পারে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকর নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে পারে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সুসংগঠিত রাজস্ব কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য।

বাজেট কাঠামো: রাজস্ব ও ব্যয়ের ভারসাম্য

প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামো অনুযায়ী মোট ব্যয় ধরা হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে প্রায় ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

সম্ভাব্য রাজস্ব কাঠামো হতে পারে—মোট রাজস্ব আয়: ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, রাজস্ব খাত (ট্যাক্সসহ): ৫ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা, নন-ট্যাক্স রেভিনিউ: ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে কর আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের জন্য রাজস্ব সংগ্রহ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে বাজেটের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জনের জন্য কর ব্যবস্থার সংস্কার, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।

উন্নয়ন ব্যয় ও এডিপি

আগামী অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হতে পারে প্রায় ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।

অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ বরাদ্দ থাকতে পারে। তবে পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এবার প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কারণ অতীতে অনেক বড় প্রকল্প অনুমোদিত হলেও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

বাজেট ঘাটতি: বাড়ছে ঋণের চাপ

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে প্রধানত দুই উৎসের ওপর নির্ভর করা হতে পারে—

অভ্যন্তরীণ উৎস: মোট সংগ্রহ লক্ষ্য- প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক উৎস: সম্ভাব্য সংগ্রহ প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ও অর্থনীতির আকার

আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হতে পারে প্রায় ৬ শতাংশ। এ অনুযায়ী দেশের মোট জিডিপির আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬৮ লাখ ৭০৭ কোটি টাকা, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৫৪৪ বিলিয়ন ডলার। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু সরকারি ব্যয় বাড়ালেই হবে না। এর সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ, রফতানি সম্প্রসারণ এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত: মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি

মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হলেও বাংলাদেশে এই দুই খাতে বরাদ্দ তুলনামূলক কম। বর্তমানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজন প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অপরদিকে স্বাস্থ্য খাতেও সরকারি ব্যয় কম হওয়ায় চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ জনগণকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এই খাতে সরকারি বিনিয়োগ এখনও সীমিত। এ কারণে আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ব্যয়ের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হতে পারে।

৩১ মার্চ শুরু এনবিআরের প্রাক-বাজেট আলোচনা

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে অংশীজনদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী ৩১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এ আলোচনা চলবে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত এনবিআর ভবনে ধারাবাহিকভাবে এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনায় দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, পেশাজীবী ও সাংবাদিকরা অংশ নেবেন। সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা বাজেট সংক্রান্ত তাদের প্রস্তাব, সমস্যা ও প্রত্যাশা তুলে ধরবেন।

প্রতিবছরের মতো এবারও বাজেট প্রণয়নের আগে অংশীজনদের মতামত গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ। এসব বৈঠকে বিশেষ করে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো খাতভিত্তিক কর, শুল্ক ও রাজস্ব সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাব ও সুপারিশ উপস্থাপন করবে। পরে এসব মতামত পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্তির বিষয় বিবেচনা করবে এনবিআর।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, প্রাক-বাজেট আলোচনার পাশাপাশি চলতি মাসের শুরুতেই বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছে লিখিতভাবে বাজেট প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। তাদের ১৫ মার্চের মধ্যে প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছিল। এসব প্রস্তাবও আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ধারাবাহিক বৈঠক শেষে আগামী ২৯ এপ্রিল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে একটি পরামর্শক সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রাক-বাজেট আলোচনায় উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণগুলো পর্যালোচনা করা হবে।

বাস্তবায়ন সক্ষমতাই বড় পরীক্ষা

সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটকে অনেকেই পুনরুদ্ধারমুখী বাজেট হিসেবে দেখছেন। তবে বড় বাজেট প্রণয়নই শেষ কথা নয়—এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন—রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।

এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাজেট অর্থনীতির গতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায় বড় আকারের বাজেটও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে। (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ