জানুয়ারির শীতের ছোঁয়ায় প্রকৃতি যেন আরও নিষ্ঠুর রূপ নিয়েছে, ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছে জনপদ। তার ওপর হিমেল হাওয়া। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট, নওগাঁ, বরিশাল ও সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় স্থবির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত কোথাও কোথাও বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঝরে কুয়াশা। কনকনে ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। বেড়েছে শীতজনিত নানা রোগ। ঘন কুয়াশার কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানের শিডিউল বিপর্যয় হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরও জানুয়ারি শীতলতম মাস হিসাবে এর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। এ মাসজুড়েই শৈত্যপ্রবাহ চলমান থাকতে পারে।
রোববার রাজধানীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি মৌসুমে সর্বনিম্ন। আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম রোববার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, ঢাকায় রোববার সকাল ৯টার দিকে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ৯টার একটু পর তা ১২.২ সেলসিয়াসে নেমে আসে। এদিন দেশের সবনিম্ন তাপমাত্রা ৯.৫ রেকর্ড করা হয় শ্রীমঙ্গলে। এই আবহাওয়াাবিদ আরও বলেন, আগামী কয়েক দিন শীতের অবস্থা মোটামুটি এরকম থাকবে। কুয়াশা কম বেশির কারণে শীতের তারতম্য হবে। কুয়াশা ও বাতাস বেশি থাকলে শীতের অনুভূতি বাড়বে। তাপমাত্রা খুব বেশি বাড়বে বা কমবে না। ১-২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম বেশি হতে পারে। আর শৈত্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে নতুন নতুন জেলা যোগ হতে পারে। আবার দু-একটি বিয়োগও হতে পারে।
আগামী কয়েক দিনের শীতের নতুন বার্তা : আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি লঘুচাপ বিরাজ করছে, যা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বিস্তৃত। এটি উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরের দিকে বিস্তার লাভ করেছে। আগামী পাঁচ দিনে আবহাওয়া শুষ্ক থাকলেও রাতের শেষ ভাগ থেকে সকাল পর্যন্ত নদী অববাহিকা এলাকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে, যা নৌ ও স্থল যোগাযোগে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। আজ ও কাল প্রধানত শুষ্ক আবহাওয়া থাকবে, আকাশ আংশিক মেঘলা এবং নদী অববাহিকায় কুয়াশা থাকবে। ৭ জানুয়ারি রাতে তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে, তবে দিনের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকবে। ৮ জানুয়ারি রাতের তাপমাত্রা স্থির থাকতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।
শাহজালাল বিমানবন্দরে শিডিউল বিপর্যয় : ঘন কুয়াশার কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪ ঘণ্টা কোনো ফ্লাইট ওঠানামা করতে পারেনি। রোববার সকাল ৬টার পর থেকে কুয়াশার তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ৮টি ফ্লাইট বিভিন্ন গন্তব্যে ডাইভার্ট করা হয়। অবতরণে ব্যর্থ হওয়া আটটি ফ্লাইটের মধ্যে ছয়টি পাঠানো হয় সিলেটে। এছাড়া একটি ফ্লাইট ভারতের কলকাতায় এবং অন্য একটি ভিয়েতনামের হ্যানয় বিমানবন্দরে পাঠানো হয়। এদিকে, আকস্মিক এই সূচি বিপর্যয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন কয়েক হাজার যাত্রী।
সিলেটে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ফ্লাইট : ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ঘন কুয়াশার কারণে নামতে না পেরে ছয়টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। পরে কুয়াশা পরিস্থিতির উন্নতি হলে ফ্লাইটগুলো যাত্রী নিয়ে নিজ নিজ নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে ওসমানী বিমানবন্দর ছেড়ে যায়।
কুড়িগ্রামে বৃষ্টির ফোঁটার মতো কুয়াশা : কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের দিনমজুর খলিল ও জয়নাল জানান, বৃষ্টির ফোঁটার মতো কুয়াশা পড়ছে। শীতের কারণে সকালে তাদের কাজে যেতে দেরি হয়। ঠান্ডায় হাত-পা চলতে চায় না, তবু কাজ না করে উপায় থাকে না। নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের রহিম আলী বলেন, ঠান্ডায় কাজ না করলে পেটে ভাত যায় না। কাজে গেলে হাত-পা জ্বালাপোড়া করে, ঠিকমতো কাজ করতে পারি না। কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা খায়রুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত ঠান্ডায় আমার ছেলের কয়েক দিন ধরে ডায়রিয়া শুরু হয়েছে। কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, শীতজনিত রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে কষ্টে খেটে খাওয়া মানুষ : রোববার জেলায় ছিল মেঘলা আকাশ। সকালে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতের দাপটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খেটে খাওয়া মানুষ। শহরের হাজিপাড়ার অটোচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, সন্ধ্যার পর আর রাস্তায় থাকা যায় না। সকাল ৮টা পর্যন্ত হাত-পা জমে যায়। প্রতি বছর শীত আমাদের রুটি-রুজিতে টান মারে। এদিকে তীব্র ঠান্ডার কারণে ব্যাহত হচ্ছে কৃষি কাজও। কাজ না পেয়ে অনেক শ্রমিককেই খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা গেছে। ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফিরোজ জামান জুয়েল জানান, ২৪ ঘণ্টায় শতাধিক শিশু নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছে।










