শেষ পর্যন্ত র্যাব বিলুপ্তিসহ সব নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুপারিশ করেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। মূলত বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে বিপুল প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে ওই কমিশন। কমিশন বলছে, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করা, সব নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা মৌলিকভাবে সংশোধনসহ একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সোমবার রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সার্বিক বিষয় তুলে ধরেন কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মাইনুল ইসলাম চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। তিনি বলেন, কমিশন বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে।
এর মধ্যে রয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্তকরণ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা মৌলিক সংশোধন, সমাজভিত্তিক প্রতিরোধমূলক সন্ত্রাসবিরোধী নীতি প্রণয়ন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০০৩-এর ১৩ ধারা বাতিল, সব বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ এবং সত্য, স্মৃতি ও জবাবদিহির প্রতীক হিসেবে ‘আয়নাঘর’গুলোকে জাদুঘরে রূপান্তরের সুপারিশ অন্তুর্ভুক্ত রয়েছে।
কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রায় ২৫ শতাংশ গুমের অভিযোগে র্যাব জড়িত, এরপর পুলিশ ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই ব্যাপকহারে গুম করেছে। বহুক্ষেত্রে সাদাপোশাকধারী বা ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়ে অপহরণ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর ধরন থেকে স্পষ্ট যে, গুম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা হিসেবে র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দ্বারা একক ও যৌথ অভিযানে সংঘটিত হয়েছে, যা বিচ্ছিন্ন অসদাচরণের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।
কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট-এর ধারা ১০ এ অনুযায়ী গুমসংক্রান্ত অভিযোগগুলোর মধ্য থেকে ফিরে না আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চার ধাপে কিছু অভিযোগ বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত দুই থেকে পাঁচ দিনের গুমের অভিযোগগুলোর তদন্তক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পৃথকভাবে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে অগ্রগতি মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশনে দাখিল করা ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে একাধিকবার দায়ের করা ২৩১টি অভিযোগ এবং যাচাই-বাছাই অন্তে প্রাথমিক ইনকোয়ারির পর গুমের সংজ্ঞার বহির্ভূত বিবেচনায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়।
ফলে মোট ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল যার মধ্যে ২৫১ জন গুম এবং ৩৬ জনের গুম পরবর্তী লাশ উদ্ধার হয়। নিখোঁজদের অবস্থান নির্ধারণে কমিশন সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক সাক্ষীসহ মোট ২২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পাশাপাশি ৭৬৫ জন গুমের শিকার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সেক্টর কমান্ডারদের কাছ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইন করা ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করলেও তাতে গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি।










