রবিবার | ১২ এপ্রিল, ২০২৬ | ২৯ চৈত্র, ১৪৩২ | ২৩ শাওয়াল, ১৪৪৭

“বড় ধরনের লুট ও পাচার—তদন্তের নথিতে শওকত, নাফিজ ও আরাফাতের নাম”

যোগাযোগ ডেস্ক

ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীকে ঘিরে মানিলন্ডারিং, নিষিদ্ধ পতাকার জাহাজ আমদানি এবং ব্যাংকিং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। একইসঙ্গে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

গোপন নথি ও একাধিক সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে অর্থপাচারের আন্তর্জাতিক রুট, অফশোর শেল কোম্পানির নেটওয়ার্ক, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য এবং ঋণ ও শেয়ার লেনদেনের অস্বাভাবিক চিত্র।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ব্যাংক, জাহাজ ব্যবসা ও করপোরেট মালিকানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সংগঠিত সিন্ডিকেটের ইঙ্গিত মিলছে। এই সিন্ডিকেটে শওকত আলীর সঙ্গে সংযুক্ত হিসেবে পাওয়া গেছে আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিজ শারাফাত এবং তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের নাম। পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ শিথিল, শেয়ার হস্তান্তর ও মালিকানা পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে এই তিনজনের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি এক নোটিশে শওকত আলী, তার পরিবার এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দেশি–বিদেশি পাসপোর্ট, সম্পদ, ব্যবসা, শেয়ারহোল্ডিং ও বিদেশে বিনিয়োগ–সংক্রান্ত বিস্তৃত নথি তলব করেছে সিআইডি। একইসঙ্গে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস রুটে অর্থপাচার, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে শেল কোম্পানির নেটওয়ার্ক এবং নিষিদ্ধ পতাকার জাহাজ এনে ভাঙার অভিযোগ, যা তদন্তকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস: অর্থপাচারের নিরাপদ রুট

তদন্তে যুক্ত একাধিক সূত্রের দাবি, শওকত আলী চৌধুরী সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের দ্বৈত নাগরিকত্ব ব্যবহার করে অর্থপাচারের একটি নিরাপদ রুট গড়ে তুলেন। দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ‘সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট’ কর্মসূচি ও ফ্ল্যাগ অব কনভিনিয়েন্স (এফওসি) সুবিধার জন্য। আর্থিক নজরদারি দুর্বল থাকায় এটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত একটি গ্রে-লিস্টেড অঞ্চলের মতো ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

সূত্র অনুযায়ী, শওকত আলী ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসসহ বিভিন্ন অফশোর এলাকায় একাধিক শেল কোম্পানি খুলে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে এলসি খুলতেন। জাহাজের প্রকৃত দামের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি মূল্য দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিপুল অঙ্কের ডলার বিদেশে পাচার করতেন।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শওকত আলীর মালিকানাধীন এস এন করপোরেশন আন্তর্জাতিক আইন ও হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে এসব জাহাজ বাংলাদেশে এনে ভাঙে।

২০১৯ সালে হাইকোর্টের এক রায়ে (রিট পিটিশন নং ৮৪৬৬/২০১৭) সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, কমোরোস, সিয়েরা লিওনসহ ব্ল্যাক ও গ্রে-লিস্টেড রাষ্ট্রের পতাকাবাহী জাহাজ বাংলাদেশে আমদানি ও বিচিং নিষিদ্ধ করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ছয় বছরে শওকত আলী অন্তত ২০টি নিষিদ্ধ পতাকার জাহাজ আমদানি করেছেন।

ক্যাশ বায়ার, ট্র্যাকিং বন্ধ ও শ্রমিক মৃত্যু

২০২৪ সালের এপ্রিলে আমদানি করা ‘এমটি সুবর্ণ স্বরাজ্য’ এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রমের একটি দৃষ্টান্ত। জাহাজটির প্রকৃত মালিক ছিল শিপিং করপোরেশন অব ইন্ডিয়া। এটি কেনা হয় দুবাইভিত্তিক একটি ক্যাশ বায়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ভারতীয় জলসীমা অতিক্রমের সময় জাহাজটির এআইএস ট্র্যাকিং রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

তদন্তকারীদের ধারণা, জাহাজটি গোপনে এস এন করপোরেশনের ইয়ার্ডে এনে কাটা হয়। ওই জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণে সাত শ্রমিকের মৃত্যু হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

এস এন করপোরেশনের শিপইয়ার্ডে গত ১৫ বছরে অন্তত ২৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করার সুযোগও পায়নি।

ব্যাংকিং খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার

জাহাজ ব্যবসার আড়ালে শওকত আলী ইবিএলের চেয়ারম্যান পদ ব্যবহার করে ব্যাংকিং খাতে বিশেষ সুবিধা আদায় করেছেন। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩ মার্চ ইবিএল বোর্ড নাফিজ শারাফাতের প্রতিষ্ঠান ‘স্ট্র্যাটেজিক ফাইন্যান্স’-এর ঋণের শর্ত শিথিল করে। একইদিনে সিডনেট কমিউনিকেশনসের তিন লাখ শেয়ার শওকত আলীর একটি প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর করা হয়। সিডনেটের শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে তখন তথ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ আরাফাত ও তার স্ত্রী ছিলেন।

একই সময় ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে ২২০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয় নাফিজ শারাফাতের প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রন্টিয়ার টাওয়ার্স বাংলাদেশ’-কে। তদন্তে দেখা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত শওকত আলী ও তার স্ত্রী। এছাড়া ন্যাশনাল টি কোম্পানির প্রায় ৭৫০ টাকা বাজারমূল্যের শেয়ার নাফিজ শারাফাত ও শেখ কবিরের সিন্ডিকেট শওকত আলীর সন্তানদের কাছে মাত্র ১১৯ টাকায় হস্তান্তর করে। এতে রাষ্ট্রের মালিকানা ৪১ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক পাঁচ শতাংশে।

তদন্তের বর্তমান চিত্র

মানিলন্ডারিং, শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য এবং ব্যাংকিং অনিয়মের একাধিক নথি সামনে এলেও শওকত আলী চৌধুরী এখনো প্রভাবশালী অবস্থানে বহাল রয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিন্ডিকেট তাকে সুরক্ষা দিচ্ছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ