শনিবার | ২৮ মার্চ, ২০২৬ | ১৪ চৈত্র, ১৪৩২ | ৮ শাওয়াল, ১৪৪৭

দিল্লিতে প্রথমবারের মতো প্রেস কনফারেন্সে যুক্ত হলেন শেখ হাসিনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে নির্বাসনে যাওয়ার পর এই প্রথম নয়া দিল্লিতে প্রকাশ্য কোনও অনুষ্ঠানে ভাষণ দিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত ‘সেভ ডেমোক্র্যাসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অডিও বার্তায় তিনি নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘অবৈধ ও সহিংস’ আখ্যা দিয়ে বলেনবাংলাদেশ এখন ‘সন্ত্রাসনৈরাজ্য ও গণতন্ত্রের নির্বাসনে’ নিমজ্জিত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ খবর জানিয়েছে।

ভাষণে শেখ হাসিনা অধ্যাপক ইউনূসকে বারবার ‘খুনি ফ্যাসিস্ট’, ‘সুদখোর’, ‘অর্থ পাচারকারী’ ও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার অভিযোগবিদেশি স্বার্থে পরিচালিত একটি ‘পুতুল সরকার’ দেশ চালাচ্ছেযা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাবেক একাধিক মন্ত্রী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা নিজে মঞ্চে উপস্থিত না থাকলেও তার অডিও বার্তা সম্প্রচার করা হয় ভরা মিলনায়তনে। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ এক গভীর অতল গহ্বরের কিনারায় দাঁড়িয়ে।’ ভাষণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার টেনে এনে বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনা দাবি করেন২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাকে একটি ‘সুনিপুণ সাজানো ষড়যন্ত্রের’ মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ওই দিনের পর থেকেই দেশ ‘সন্ত্রাসের যুগে’ প্রবেশ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার কথায়, ‘গণতন্ত্র এখন নির্বাসনে। মানবাধিকার মাটিতে মিশে গেছেসংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিভে গেছেনারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা লাগামহীন।’

দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে দাবি করে শেখ হাসিনা বলেনরাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র লুটপাটচাঁদাবাজি ও দলবদ্ধ সহিংসতা চলছে। ‘জীবন ও সম্পত্তির কোনও নিরাপত্তা নেই,’ বলেন তিনি।

ভাষণের বেশিরভাগ অংশজুড়ে ছিল অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ। শেখ হাসিনার অভিযোগইউনূস দেশকে ‘রক্তশূন্য’ করছেন এবং বিদেশি শক্তির কাছে ভূখণ্ড ও সম্পদ তুলে দিয়ে বাংলাদেশকে একটি ‘বহুজাতিক সংঘাতের আগুনে’ ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এই খুনি ফ্যাসিস্ট আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে।’

একই সঙ্গে ভাষণে ছিল সমর্থকদের উদ্দেশে আহ্বান। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ‘গণতান্ত্রিকপ্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তি’র প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়ে শেখ হাসিনা বলেনশহীদদের রক্তে লেখা সংবিধান পুনরুদ্ধার করতে হবে। ভাষণের শেষ দিকে ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে মিলনায়তন।

আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের একমাত্র বৈধ গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ দেশের সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।’ তার দাবিজনগণের সহায়তায় দলটি আবার ‘ছিনিয়ে নেওয়া সমৃদ্ধ স্বদেশ’ ফিরিয়ে আনবে।

ভাষণে শেখ হাসিনা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেনযা তিনি দেশের ‘আরোগ্য’ নিশ্চিত করতে জরুরি বলে উল্লেখ করেন। প্রথম দাবি হিসেবে তিনি ইউনূস নেতৃত্বাধীন ‘অবৈধ প্রশাসন’ অপসারণের কথা বলেন এবং দাবি করেনএ সরকার বহাল থাকলে দেশে কখনোই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় দাবিতে তিনি প্রতিদিনের সহিংসতা ও নৈরাজ্য বন্ধের আহ্বান জানানযা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও নাগরিক সেবার জন্য অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন। তৃতীয় দাবিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুনারী ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার ‘অটল নিশ্চয়তা’ চাওয়া হয়।

চতুর্থ দফায় তিনি সাংবাদিকআওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ বন্ধ করার আহ্বান জানান এবং বিচার বিভাগকে ‘নিরপেক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন। পঞ্চম ও শেষ দাবিতে তিনি গত এক বছরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি ‘নতুন ও সত্যিকারের নিরপেক্ষ তদন্ত’ পরিচালনার আহ্বান জানান।

সমর্থকদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আপনাদের পাশে আছে।’ তার দাবিঅন্তর্বর্তী সরকার জনগণের কণ্ঠস্বর শুনতে ব্যর্থ হয়েছে। ‘একসঙ্গে আমরা শক্তিশালী,’ বলেন তিনি।

এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছেএই ভাষণের সুর স্পষ্ট করে দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদ্যমান তীব্র মেরুকরণ। শেখ হাসিনা বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি সাধারণ ক্ষমতার পরিবর্তন নয়বরং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বনাম চরমপন্থা ও বিদেশি প্রভাবের লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছেন।

দিল্লির এই বক্তব্যে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেননির্বাসন থেকেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বয়ান প্রভাবিত করার চেষ্টা তিনি অব্যাহত রাখবেন। তার বার্তা ছিল স্পষ্ট, ‘এখন হাল ছেড়ে দেওয়ার সময় নয়। যারা দেশ ধ্বংস করতে চায়তাদের হাত থেকে বাংলাদেশকে উদ্ধার করতে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ