রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে বাস পড়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। অসুস্থ অবস্থায় গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চিকিৎসাধীন আছেন আরও একজন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি অন্তত ৩৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এদিকে, মারা যাওয়া ও নিখোঁজদের স্বজনরা ফেরিঘাট এলাকায় আহাজারি করছেন। যারা সাঁতরে তীরে উঠতে পেরেছেন, তাদের চোখেমুখে এখন কেবল প্রিয়জনকে হারানোর আতঙ্ক আর শোকের ছায়া।
‘কত করে কইলাম তোমরা বাড়ি থাকো, বউ কইল না তুমি একলা যাইবা। আমার ভালো লাগে না। এখন আমারে ছাইড়া কেমনে একলা রাইখা চইলা গেলা। আমি এখন কী করমু?’— এভাবেই স্ত্রী-সন্তানকে হারিয়ে বিলাপ করছিলেন কুষ্টিয়া থেকে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের এক যাত্রী।
নিখোঁজ স্ত্রী ও শিশুসন্তান আবদুল্লাহর জন্য বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন এক যাত্রী। সাঁতরে তীরে ওঠা ওই যাত্রী জানান, আগামী ২৯ মার্চ তার কর্মস্থলে ডিউটি থাকায় তিনি একাই ঢাকায় ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্ত্রী স্বামীর সঙ্গ ছাড়তে চাননি। বলেছিলেন, ‘তোমারে না দেখলে আমার ভালো লাগে না, অস্থির লাগে।’ সেই ভালোবাসাই আজ কাল হলো। বাসটি যখন ফেরিতে ওঠার সময় হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গভীর পদ্মায় তলিয়ে যায়, ওই যাত্রী কোনোমতে সাঁতরে প্রাণে বাঁচলেও তার চোখের সামনেই তলিয়ে যান প্রিয় স্ত্রী ও সন্তান।
সৌহার্দ্য বাসে থাকা আবদুল আজিজুল নামে এক যাত্রী জানান, তিনি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার গান্ধীমারা এলাকা থেকে এই বাসটিতে উঠেছিলেন। নদীতে পড়ে যাওয়ার পর তিনি সাঁতরে উপরে উঠতে পারলেও তার স্ত্রী ও শিশুসন্তান নিখোঁজ রয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে ফেরা যাত্রীদের ভাষ্যমতে, বিকাল সোয়া ৫টার দিকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি ৩ নম্বর পন্টুন দিয়ে ফেরিতে উঠতে গেলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। মুহূর্তে বাসটি উল্টে নদীতে পড়ে তলিয়ে যায়। বাসে থাকা ৪৫ জন যাত্রীর কয়েকজন তীরে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। বাকিরা নিখোঁজ রয়েছেন। মারা যাওয়া দুজন হলেন রেহেনা বেগম (৬০) ও মর্জিনা বেগম (৫৫)। রেহেনার বাড়ি রাজবাড়ীর ভবানীপুর এলাকায়। মর্জিনা বেগমের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। চিকিৎসাধীন আছেন নুসরাত (২৯)। তিনি পেশায় চিকিৎসক। তবে নিখোঁজ কারও এখন পরিচয় পাওয়া যায়নি।
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, ‘বাস দুর্ঘটনায় তিন জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে দুজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্যজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
এদিকে, তলিয়ে যাওয়া বাসটি শনাক্ত করতে পেরেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। বুধবার রাতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদর দফতর থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীর আনুমানিক ৩০ ফুট গভীরে তলিয়ে যায়। তবে বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। গোয়ালন্দ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের একটি ইউনিট এবং আরিচা স্টেশনের একটি ডুবুরি ইউনিট উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। ঢাকা ও ফরিদপুর থেকে আরও দুটি ডুবুরি ইউনিট ঘটনাস্থলে যাচ্ছে বলেও জানায় ফায়ার সার্ভিস।
ঘটনার পরপরই উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা এসে পৌঁছালেও এখন পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান শুরু করতে পারেনি। এতে নিখোঁজদের স্বজনরা উত্তেজিত হয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জেলা পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌ-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে। ঘটনাস্থলে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা অবস্থান করছেন।
স্থানীয় ও বেঁচে যাওয়া বাসযাত্রীদের ভাষ্যমতে, ওই বাস থেকে পাঁচ থেকে সাত যাত্রী শুরুতেই বের হতে পেরেছেন। বাকিরা নিখোঁজ রয়েছেন। অন্তত ৪০ জন নিখোঁজ আছেন।
বিকাল সোয়া ৫টার দিকে ঘাটের ৩ নম্বর পন্টুন থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি পড়ে গেলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। সোয়া ৫টার দিকে বাসটি নদীতে পড়ে গেলেও দৌলতদিয়া ২ নম্বর ফেরিঘাটে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা রাত ৮টা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ শুরু করেনি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বলেন, ‘বিকাল ৫টার কিছু পর সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে আসে। এ সময় ঘাটে থাকা একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। অল্পের জন্য তাতে উঠতে না পারায় অপর ফেরির জন্য বাসটি অপেক্ষা করছিল। সোয়া ৫টার দিকে ওই ঘাটে ‘হাসনা হেনা’ নামক একটি ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি এসে সজোরে পন্টুনে আঘাত করে। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।’
ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, বাসটি পন্টুনের নিচে আছে। যে কারণে বাসটির দরজা ও জানালা ভেঙে তারা ভেতরে ঢুকতে পারছেন না। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি।









