জমিজমা ও সহায়-সম্বল বিক্রি করে ইউরোপ স্বপ্নে বিভোর সুনামগঞ্জের পরিবারগুলো এখন দিশেহারা। গ্রিসের উপকূলে ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মধ্যে ১২ জনেরই বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়। শনিবার নৌকাডুবির ঘটনার পর তাদের পরিবারগুলোতে চলছে আহাজারি। পাশাপাশি দালালচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর।
চিলাউড়া গ্রামের নিহত নাইম মিয়ার বাবা দুলন মিয়া বলেন, ‘জায়গা-জমি বিক্রি করে ছেলেকে ইছগাঁওয়ের আদম ব্যবসায়ী আজিজের মাধ্যমে ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া পাঠিয়েছিলাম। দালাল আমার ছেলের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ১৭ লাখ টাকা দেওয়ার পরও সে আমার ছেলেকে অনাহারে রেখেছে। রাবারের নৌকায় করে সাগরে নিয়ে হত্যা করেছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভূমধ্যসাগরে নিহতের মধ্যে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ৬ জন, জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন ও দোয়ারাবাজার উপজেলার একজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতরা হলেন– দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আব্দুল গনির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), মৃত ক্বারি ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান (২৫), রাজানগর ইউনিয়নের জাহানপুর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮)। বাউরী গ্রামের সোহানূর রহমান (২৬) এবং মাটিয়াপুরের মেহেদী হাসান তায়েফ। জগ্ননাথপুর উপজেলার নিহত ৫ জনের মধ্যে টিয়ারগাঁও এলাকার শায়েখ আহমদ জয়, ইছগাঁওয়ের আলী আহমদ, পাইলগাঁওয়ের আমিনুর রহমান, চিলাউরা গ্রামের ইজাজুল ও নাইম মিয়া। তাদের মধ্যে দোয়ারাবাজার উপজেলার অভ্র ফাহিম নামে আরও এক যুবক রয়েছেন।
নিহতদের স্বজনরা জানান, মানবপাচারকারী একাধিক চক্র ১২-১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে ইতালিতে নিয়ে যাবে বলে তাদের আফ্রিকার লিবিয়ায় নিয়ে যায়। লিবিয়ায় দালালরা ‘গেইম ঘরে’ দীর্ঘদিন আটকে রেখে রাবারের নৌকায় করে ৪৮ জন অভিবাসন প্রত্যাশী নিয়ে সাগর পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি নেয়। দীর্ঘদিন সাগরে অনাহার ও রোগাক্রান্ত হয়ে ২২ জনের মৃত্যু হয়। তাদের মরদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সপ্তাহখানেক সাগরে ভাসতে থাকার পর ২৮ মার্চ গ্রিসের কোস্টগার্ড ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। জীবিত ফেরা অভিবাসী দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের রুহান নামের যুবকের কাছ থেকে অন্যদের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হন স্বজনরা। জানা যায়, তারাপাশা গ্রামের তিন জনসহ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার অনেকেই মারা গেছেন। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি নিজেও গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে রয়েছেন।
জীবিত ফেরা কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আব্দুল কাদির নামে আরেক যুবকের সাক্ষাৎকার ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার নিহতদের তথ্য ও ছবি প্রকাশ পায় এবং পরিবারের স্বজনরা তাদের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
অপরদিকে, সাগরে মৃত্যুর ঘটনায় আর্তনাদ চলছে নিহতদের পরিবারে। জমিজমা ও সহায়-সম্বল বিক্রি করে ইউরোপ স্বপ্নে বিভোর পরিবারগুলো এখন দিশেহারা। চান স্বজনের লাশ। দালালচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দাবি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর।
সাগরে সলিল সমাধি হয়েছে উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের দুবাইফেরত যুবক নাইম মিয়ার। সন্তানের মৃত্যুর খবরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন আঁখি বেগম। শেষবারের মতো দেখতে যান নাড়ীছেঁড়া ধনকে। দুই বছরের ফুটফুটে সন্তান ওয়াজিফাকে কোলে নিয়ে আহাজারি করছেন নাইমের সদ্য বিধবা স্ত্রী।
চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, ‘ভূমধ্যসাগরে অনাহারে আমার ইউনিয়নের দুই যুবক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়াও জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলার আরও কয়েকজন যুবক মারা গেছেন। দালালের প্রলোভনে তরুণরা মৃত্যুর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিষয়টিতে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। দালালদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘নিহতরা অবৈধ পন্থায় বিদেশ যাওয়ায় আমাদের কাছে এখনও সঠিক তথ্য আসেনি। তবে স্থানীয়ভাবে অনেকের মৃত্যুর খবর শোনা যাচ্ছে। আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ করছি। উপজেলা প্রশাসন তথ্য সংগ্রহ করছে।’
দালালদের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।










