মঙ্গলবার | ৩১ মার্চ, ২০২৬ | ১৭ চৈত্র, ১৪৩২ | ১১ শাওয়াল, ১৪৪৭

কোন গাফিলতিতে সারা দেশে হামের সংক্রমণ

যোগাযোগ ডেস্ক:

শিশুদের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের গাফিলতির কারণে এখন সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত টিকা দেওয়ার ব্যবস্থার পাশাপাশি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগেই সবাইকে সচেতন হতে হবে। শিশুর পুষ্টি চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে করোনাকালের মতো সামাজিক দূরত্ব এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।

সাধারণত হাঁচি এবং কাশি থেকে খুব দ্রুত হাম ছড়িয়ে পড়তে পারে। একজন আক্রান্ত শিশুর মাধ্যমে ১০ থেকে ১৫ জন কিংবা তার চেয়েও বেশি শিশু আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত শিশু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়ে আবার সুস্থ শিশুকে আক্রান্ত করতে পারে। সাধারণত শূন্য থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এই রোগের আক্রান্তের হার সব চাইতে বেশি।রাজধানী বস্তি এলাকার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে ব্যাপকভাবে হাম ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন আক্রান্ত শিশুর সংখ্যার সঙ্গে মায়ের কোল খালি হওয়ার মতো উদ্বেগজনক খবর সামনে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হচ্ছে— এখনও পর্যন্ত অন্তত ৪৬ শিশু হামে আক্রন্ত হয়ে মারা গেছে।

মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে কর্মরত জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. শ্রেবাশ পল গণমাধ্যমকে জানান, চলতি বছরের মাত্র প্রথম তিন মাসেই ৫৬০ জন হাম রোগী ভর্তি হয়েছে, যেখানে আগের পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৯টি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৩৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৮৮ জন ভর্তি হলেও মার্চ মাসে হঠাৎ করে এই সংখ্যা বেড়ে ৫৬০-এ পৌঁছেছে। যেখানে আগের বছরগুলোতে পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ১০ শতাংশ পজিটিভ পাওয়া যেত, সেখানে এ বছর প্রায় ৯০ শতাংশ নমুনাই পজিটিভ এসেছে। তিনি বলেন, “আক্রান্ত শিশুদের বেশিরভাগেরই বয়স ৯ মাসের নিচে।’’

এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘হামে যে শিশুরা মারা গেছে তা পরোক্ষ পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ড। এই হত্যার দায় নিঃসন্দেহে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। যেহেতু সে সময় শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়নি। দায় ওনাদেরই নিতে হবে।’’

হামে আক্রান্ত হলে কী উপস্বর্গ দেখা দেয়

একটি শিশু হামে আক্রান্ত হলে শুরুতে জ্বর, সর্দি ও কাশি দেখা যায়, এরপর মুখের ভেতরে ছোট ছোট দাগ, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। কোনও জটিলতা না থাকলে সাধারণত সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে রোগটি সেরে যায়। তবে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, ব্রেন ইনফেকশন এবং মৃত্যুও ঘটাতে পারে হাম।

এখন কেন বাড়ছে হামের সংক্রমণ

উদ্বেগের কারণটা ঠিক এখানেই। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় একটি শিশু জন্মের পর দুই ধাপে হামের টিকা দেওয়া হয়। এরমধ্যে টিকার প্রথম ডোজ পেয়ে থাকে ৯ মাস বয়সে। প্রথম ডোজ নিলে সুরক্ষার হার দাঁড়ায় ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ। জন্মের ১৫ মাস বয়সে টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। তখন সুরক্ষা হার দাঁড়ায় ৯৭ থেকে ৯৯ ভাগ। হামের টিকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দ্বিতীয় ডোজ। অনেক শিশু প্রথম ডোজ নেওয়ার পর আর দ্বিতীয় ডোজ নিতে আসে না। এতে তার সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না।

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) নিয়ে জতিসংঘ গত বছর যে রিপোর্ট দিয়েছে তাতে দেখা যায়— করোনার সময় ২০২০ সালে হাম রুবেলার (এম আর) টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া নিয়েছিল ৯১ দশমিক ৪১ ভাগ শিশু, আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছিল ৮৯ দশমিক ৯৬ ভাগ শিশু। সেই হিসেবে করোনার কারণে ইপিআই কর্মসূচি বাঁধাগ্রস্ত হওয়ায় ১০ ভাগের বেশি শিশু ওই বছর হাম রুবেলা টিকার আওতার বাইরে ছিল। এরপর ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত এই টিকার কাভারেজ প্রায় শতভাগের কাছাকাছি ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে আবার দেখা যায়— টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছে ৯৭ দশমিক ৯৬ ভাগ শিশু। অপরদিকে দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ৯৬ দশমিক ১৫ ভাগ শিশু। সেখানেও ৪ ভাগের কাছাকাছি শিশু টিকার বাইরে রয়েছে। গত বছর ২০২৫ এসে টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছে ৯২ দশমিক ৭৩ ভাগ শিশু, আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ৯০ দশমিক ৭৮ ভাগ শিশু। সঙ্গত কারণে এই তিন বছরের হিসাব বলছে— ইপিআই থেকে ২৪ ভাগ শিশু হাম রুবেলার টিকা পায়নি। অনেকে মনে করেন, হামের এক ডোজ টিকাতেই সুরক্ষা পাওয়া যায়। এজন্য আর দ্বিতীয় ডোজ নিতে আসে না। কিন্তু এটি একটি মারাত্মক ভুল, হামের টিকা দুই ডোজ না নিলে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যায় না।

আছে আরও সমস্যা

৯ থেকে ১৫ মাসের বাইরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউ এইচ ও) গাইড লাইন অনুযায়ী— প্রতি চার বছর পরপর আরও এক ডোজ টিকা দেওয়া হয়। একে বলা হয় এম আর ক্যাচ আপ প্রোগ্রাম। সাধারণত যেসব শিশু নিয়মিত টিকা নেয়নি, তারা এই টিকার আওতায় সম্পর্ণ সুরক্ষা পায়। যে শিশু নিয়মিত টিকা নিয়েছে সেও এই টিকা গ্রহণ করে। দেখা গেছে, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ায়ি থেকে মার্চে এই টিকা দান কর্মসূচি ছিল। ঠিক তখনই বাংলাদেশে করোনা মহামারি শুরু হয়। ফলে তখন টিকা দান কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে হতে পারেনি। এরপর ডব্লিউএইচও-এর হিসাবে ২০২৪ সালে এই টিকার ফলোআপ হওয়ার কথা। কিন্তু রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতায় গত বছর এই টিকা দেওয়া হয়নি। ফলে ৫ থেকে ৬ বছরের ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়েছে। আর এতে করেই হামের সংক্রমণ বেড়ে চলেছে।

উত্তরবঙ্গে সংক্রমণ বেশি

হামে আক্রান্ত হলে কিংবা আক্রান্ত শিশুর অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ার কারণ হিসেবে শিশুর পুষ্টিহীনতাকে দায়ী করা হচ্ছে। এজন্য ঢাকার বস্তি এলাকার শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেশি। আবার একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে উত্তরবঙ্গে। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলের শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। উত্তরবঙ্গে প্রায় পরীক্ষিত নমুনার মধ্যে ৩১ ভাগ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।

সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে

আক্রান্ত এলাকায় অতিরিক্ত চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো হচ্ছে। এর বাইরে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহের হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আইসিইউ ভেন্টিলেশনের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। যাতে আক্রান্ত শিশুর অবস্থা খারাপ হলে দ্রুত তাকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হয়। এর বাইরে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এজন্য ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সোমবার (৩১ মার্চে) জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সুত্র : বাংলা ট্রিবিউন

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ