দেশের ভোজ্যতেল বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু সিন্ডিকেট, অসাধু ব্যবসায়ী এবং আমদানিকারক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অনৈতিক মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করছে। অভিযোগ রয়েছে, ভোজ্যতেল আমদানিকারক ও পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ ও আবুল খায়ের গ্রুপ সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং ডলার সংকটের অজুহাত দেখিয়ে স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ানো হচ্ছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির কোনও বৈধ কারণ নেই। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির নিজে বাজারে গিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন।
বাজারে কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দাম
পাইকারি ও খুচরা বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৩০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। বেসরকারি ভোক্তা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জানিয়েছে, বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরকার নির্ধারিত দাম ১৭০ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ১৮৫ টাকার খোলা সয়াবিন ও ১৬২ টাকার পাম অয়েলের দামও বেড়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোজ্যতেলের বাজার অস্থিরতার মূল কারণ হলো সরবরাহ চেইন সিন্ডিকেট। শীর্ষ কয়েকটি কর্পোরেট গ্রুপ আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণ করে বাজারে ইচ্ছাকৃত সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে। বোতলজাত ও খোলা তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খুচরা বাজারে প্রতি লিটারে ৩০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দাম না মেনে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছামতো সয়াবিন ও পাম অয়েল বিক্রি করছেন। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও ডলারের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়েছে। তদারকির ঘাটতি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় অসাধু চক্র বারবার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদের পর সরবরাহ সংকট, সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং ডিলার পর্যায়ে কৃত্রিম অভাবের কারণে হঠাৎ সয়াবিন তেলের বাজার অস্থির হয়েছে। বোতলজাত তেল উধাও হওয়ায় খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দাম আরও বাড়ানোর জন্য সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে, ফলে প্রতি লিটারে ১৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের দুর্বল তদারকির সুযোগে শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। বাজার অস্থিরতা কাটাতে তারা পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: সরকার নির্ধারিত দামে সয়াবিন তেল বিক্রি নিশ্চিত করা; সিন্ডিকেট চক্রকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া; মজুতদারির বিরুদ্ধে নিয়মিত কঠোর অভিযান পরিচালনা; অস্বাস্থ্যকর নন-ফুড গ্রেড ড্রামে তেল বিক্রি বন্ধ করা।
সরকারি নজরদারি ও অভিযানের তথ্য
চট্টগ্রামে র্যাব ২২ হাজার ৬৪২ লিটার সয়াবিন তেল জব্দ করেছে এবং দুই প্রতিষ্ঠানকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। এছাড়া গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ মজুতদারির ঘটনা ধরা পড়েছে।
বাজারে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে গেছে। খোলা তেল কিনতে ক্রেতারা বাধ্য হচ্ছেন, যা সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। ঈদের পর থেকে অসাধু সিন্ডিকেট দাম বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, অপকৌশলের মাধ্যমে বাজার অস্থির করার অভিযোগ সঠিক নয়। বৈশ্বিক সংকট ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। তবে আমরা সরকার নির্ধারিত দামে সরবরাহ নিশ্চিত করছি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান জানান, বাজারে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেও আকস্মিকভাবে বাজার পরিদর্শন করছেন।










