শুক্রবার | ১৫ মে, ২০২৬ | ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ | ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭

চোখের সামনে ডুবছে স্বপ্ন, কান্নায় ভেঙে পড়েছেন কৃষকরা

একজন কৃষক সারাবছর রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে লাঙলের ফলায় বুনে যায় ফসল। সোনালি ফসল ঘরে তোলার স্বপ্নে অপেক্ষায় কাটে প্রতিটি দিন। টানা বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে ধান তলিয়ে সেই স্বপ্ন ভেঙে দিশাহারা নেত্রকোনার কেন্দুয়ার কৃষকরা। ডুবে যাওয়া ক্ষেত দেখে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, টানা বৃষ্টি, ঝড়, ঝড়ো হাওয়া, বজ্রপাতে হাওরপাড়ের মানুষের বুকের ভেতর বয়ে গেছে হাহাকার। হাওরের অধিকাংশ ফসল ভাসান পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও ধানের গোছা পানির সঙ্গে মিশে আছে। কৃষকরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দু-মুঠো ধান ফিরে পেতে।
টানা ভারি বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের কারণে নেত্রকোনার কেন্দুয়ার হাওরাঞ্চলে আবারও ফিরে এসেছে পুরনো বিপর্যয়ের সেই চেনা দৃশ্য। চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের ঘাম, শ্রম আর বছরের একমাত্র স্বপ্ন-সোনালি বোরো ধান। অনেক কষৃক ক্ষেতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়।
জালিয়ার হাওর অধ্যুষিত উপজেলার মোজাফরপুর ইউনিয়নের চারিতলা গ্রাম এলাকাসহ কেন্দুয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত অল্প সময়ের মধ্যেই পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
প্রতিবছর একই ক্ষতির মুখে পড়লেও স্থায়ী সমাধানের অভাবে সবচেয়ে বেশি চরম মূল্য চোকাচ্ছেন এই অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরা।
কোমর সমান পানিতে নেমে ধান কাটার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন অনেক কৃষক। প্রকৃতির রুদ্ররোষের সঙ্গে অসম লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারছেন না তারা। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে কৃষকরা এখন চরম অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারের মুখে।
উপজেলার মোজাফরপুর ইউনিয়নের চারিতলা গ্রামের জালিয়ার হাওরের কৃষক রাসেল মিল্কী বলেন, ‘অতি বৃষ্টিতে জালিয়া হাওরের বোরো ধান পানিতে ডুবে গেছে।
হাওড়ের আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে বাতাসে বোবাকান্না ভেসে আসে। মোজাফরপুর, মহুরিয়া, চৌকিধরা, নয়াপাড়া, চারিতলা, মামুদপুর, হারুলিয়া, তেলিপাড়ার কৃষক আজ সর্বশান্ত। জালিয়া হাওর নিয়ে এর আগেও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্যর্থ হয়েছি কিনা জানিনা। হাওরপাড়ের কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’
কান্দিউড়া ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামের সাজু মেম্বার বলেন, ‘এইউনি য়নের গাব্বুয়ার হাওর, বিষ্ণুপুর, জালালপুর কালিয়ান বিল, নওপাড়ার বৌসন বিল, বলাইশিমুলের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
মানবাধিকার কর্মী হলি খান বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে উপজেলার চিরাং ইউনিয়নের ছিলিমপুর কালিয়ান বিল পরিবেষ্টিত বাট্টা- ছিলিমপুর গ্রামের হাজারো মানুষের ফসলের জমি। অনেকেই প্রতিকূল আবহাওয়ায় কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে গেছে।
কেন্দুয়া উপজেলার দলপা ইউনিয়নের ইটাউতা ও চাতল গ্রামের কৃষকদের একমাত্র সম্বল। কৃষক মাসুদ রানা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে আসাদ, তুষারের মা, আজি রহমান, লেখছু, জামাল, শিল্পী বাশার ও শিহাবসহ আরো অনেকেই একমুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। এবছরের একমাত্র সম্বল বোরো ফসল হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
লিংকন বলেন, পাটেশ্বরী নদীর ধারে “আবদাইন হাওর” ওই এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলাশয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নদী খনন না হওয়ায় উজানের পানি সহজে নিষ্কাশন হতে পারে না। ফলে প্রতিবছরই সামান্য বৃষ্টি হলেই হাওরের ফসল পানিতে ডুবে যায়।
স্থানীয়রা দ্রুত পাটেশ্বরী, নদী ও খাল খনন স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে কৃষকদের এমন ক্ষতির সম্মুখীন হতে না হয়।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টিতে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে কেন্দুয়া উপজেলায় কৃষকদের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অতিরিক্ত বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে বোরো ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল। চলমান বৃষ্টিপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বোরো ধান। প্রায় ৪০০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া আরো কয়েকশ হেক্টর জমির বোরো ধান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এদিকে পাট চাষের জমিও ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যে ৭ হেক্টর জমির পাট পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে এবং আরও বেশ কিছু জমি ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সবজি ফসলেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৫ হেক্টর জমির সবজি এবং ০.৪৫ হেক্টর জমির আউশ ধানের বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে সরকারি হিসেবে যে পরিমাণ ক্ষতির কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে আরো বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।
নেত্রকোনা জেলা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, বৈরী আবহাওয়া আরো কয়েকদিন থাকতে পারে। এতে কৃষকের দুশ্চিন্তা আরো বাড়ছে। যারা কষ্ট করে কিছু ধান কেটেছিল। তারা অতিবৃষ্টির কারণে সেই ধান রোদে শুকাতে পারছে না।
কেন্দুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা উজ্জ্বল সাহা জানান, ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে উপজেলায় এখনো পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার ১০০ জন কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বোরো ধানের ৪০০ হেক্টর জমি নিমজ্জিত, পাট ক্ষেত ৫.৭ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত, সবজি ক্ষেত ৫.৫ হেক্টর ও আমন বীজতলা ০.৪৫ হেক্টর পানিতে তলিয়ে গেছে।
তিনি আরো জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। পরবর্তী সময় স্থানীয় এমপির মাধ্যমে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে কথা বলে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ