রবিবার | ৩ মে, ২০২৬ | ২০ বৈশাখ, ১৪৩৩ | ১৫ জিলকদ, ১৪৪৭

৪০ বছর আগে নিখোঁজ

পাঞ্জাব থেকে ছেলেকে নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে জাহানারা

যোগাযোগ ডেস্ক :

অন্তত ৪০ বছর আগে নিখোঁজ হন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের শাহাপাড়া গ্রামের মোছা. জাহানারা। দীর্ঘদিন তার সন্ধান না পেয়ে পরিবারের লোকজন ভেবেছিলেন তাকে হয়তো আর কোনো দিন ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান পেরিয়ে সম্প্রতি ভারতের পাঞ্জাব থেকে ছেলে মানজিদার সিং (৩০)-কে সঙ্গে নিয়ে জন্মভিটায় ফিরেছেন জাহানারা।
জাহানারাকে ঘিরে শাহাপাড়া গ্রামে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
বাড়ির উঠানে পা রাখতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন জাহানারা। একে একে ভাই-বোন, ভাতিজা-ভাতিজি ও স্বজনদের বুকে জড়িয়ে ধরেন। দীর্ঘ চার দশকের বিচ্ছেদ যেন মুহূর্তেই গলে যায় অশ্রুধারায়। তার চোখে তখন আনন্দ, বেদনা, বিস্ময় আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের দীর্ঘশ্বাস।

জাহানারা মৃত তমিজ উদ্দিনের মেয়ে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছোটবেলায় তিনি হঠাৎ করে নিখোঁজ হন। বহু খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। গত ২৬ এপ্রিল গভীররাতে ঠাকুরগাঁওয়ে নিজের মাতৃভূমিতে আসেন তিনি।
তার সঙ্গে ছিলেন ছেলে মানজিদার সিং (৩০)। প্রথমে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের পীরবাড়ি গ্রামে তার বোনের বাড়িতে ওঠেন। পরদিন সোমবার সকাল ১০টার দিকে তিনি নিজ গ্রাম শাহাপাড়ায় আসেন।
জাহানারাকে দেখতে সকাল থেকেই ভিড় করেন শত শত মানুষ। কেউ তাকে একনজর দেখতে, কেউবা তার সঙ্গে কথা বলতে, আবার কেউ পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে ছুটে আসেন।
জাহানারার ভাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার বোনকে প্রায় ৪০ বছর আগে আমাদের পাশের বাড়ির ফখদুল নামে এক ভাতিজা কৌশলে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। আমরা তখন কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। অনেক খুঁজেছি, অনেক জায়গায় গেছি, কিন্তু কোনো খোঁজ পাইনি। আজ এত বছর পর বোনকে ফিরে পেয়ে মনে হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের ঘরে ফেরত পাঠিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, আমরা ভেবেছিলাম, বোন হয়তো আর বেঁচে নেই। কিন্তু সে আজ নিজের পায়ে হেঁটে আমাদের উঠানে এসেছে। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
জাহানারার আরেক ভাই বলেন, শৈশবের সেই মুখ আজও ভুলিনি। এত বছর পরও তাকে দেখে একমুহূর্তে চিনে ফেলেছি। মনে হচ্ছে, সময় যেন থমকে গেছে।
জাহানারার ভাতিজি সুমাইয়া আক্তার বলেন, ছোটবেলা থেকে ফুপুকে নিয়ে গল্প শুনেছি। কখনো ভাবিনি, তাকে সামনে দেখব। আজ তাকে জড়িয়ে ধরে মনে হয়েছে, হারানো এক টুকরো জীবন ফিরে পেয়েছি।
প্রতিবেশী আবদুল করিম বলেন, জাহানারাকে ঘিরে পুরো গ্রাম উৎসবে মেতেছে। কিন্তু আনন্দের মাঝেও রয়েছে বেদনার ছাপ। এতগুলো বছর একজন মানুষ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন, এটা ভাবতেই কষ্ট লাগে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ভারতে গিয়ে জাহানারা নতুন নাম গ্রহণ করেন। পরে পাঞ্জাবের তাংতারা এলাকায় বিয়ে করেন। বর্তমানে তিনি চার সন্তানের জননী। তার সংসার এখন ভারতেই।
জাহানারা নিজেও বারবার আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, আমি কখনো ভাবিনি, আবার এই বাড়িতে ফিরতে পারব। আমার শৈশব, আমার ভাই-বোন, সবকিছু আজ চোখের সামনে।
তার ছেলে মানজিদার সিং বলেন, মায়ের মুখে সবসময় তার গ্রামের কথা শুনেছি। আজ সেই গ্রামে এসে আমি খুবই আবেগাপ্লুত।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ