নারায়ণগঞ্জ শহরে অভিযানে যাওয়া র্যাব সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে বাহিনীটির অন্তত তিন সদস্য আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর মাসদাইর বোয়ালিয়া খাল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচএম সাজ্জাদ হোসেন।
এদিন ভোরে রূপগঞ্জ উপজেলার চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে অভিযানে যাওয়া পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ওসিসহ অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ছিনিয়ে নেওয়া হয় গ্রেপ্তার এক যুবদল নেতাকে।
বিকালে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে র্যাব জানায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে মাসদাইরের বোয়ালিয়া খাল এলাকায় র্যাব-১১ এর একটি দল তথ্য সংগ্রহের কাজ করছিলেন। এ সময় স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীরা ধারাল অস্ত্র নিয়ে র্যাবের ওপর হামলা চালায়।
এতে আহত হন র্যাব-১১ এর কর্পোরাল নাজিবুল, কনস্টেবল মাহি ও ইব্রাহিম। তাদের মধ্যে গুরুতর নাজিবুল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছে র্যাব।
এ বিষয়ে র্যাব-১১ এর উপপরিচালক আব্দুর রশীদ মোবাইল ফোনে জানান, গোয়েন্দা টিমের চারজন ঘটনাস্থলে তথ্য সংগ্রহে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন। এ সময় চারজনই সিভিল পোশাকে ছিলেন। দুইজন র্যাব সদস্যকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়েছে। র্যাব ও পুলিশ জানায়, ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর মাসদাইরের গাইবান্ধা বাজার এলাকায় সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন র্যাব সদস্যরা। সেই সময় জাহিদ ও তার সহযোগীদের গুলি চালালে ওই এলাকার বাসিন্দা এক নারী আহত হন।
“এবারের হামলাতেও সন্ত্রাসী জাহিদ ও মাসুদ ওরফে ‘বুইট্টা মাসুদ’-এর সহযোগীরা র্যাব সদস্যদের উপর হামলা চালিয়েছে। তারা সবাই চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী,” নাম প্রকাশ না করা শর্তে র্যাব-১১ এর এক কর্মকর্তা জানান। এদিন ঘটনার এক সিসিটিভি ভিডিওতে র্যাবের উপর হামলা চালানো কয়েকজন যুবকের হাতে রাম দা ও চাপাতি দেখা যায়। বোয়ালিয়া খাল এলাকায় বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুস সালামের। তিনি বলেন, “বোয়ালিয়া খাল ও আশেপাশের এলাকা মাদক ব্যবসায়ী ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের অভয়ারণ্য। প্রায় সময়ই নিজেদের মধ্যেও মারামারির ঘটনা ঘটে। এলাকাবাসী তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতেও ভয় পান।”
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ এলাকায় আগে বোয়ালিয়া নামে একটি খাল প্রবাহিত হত। পরে স্থানীয় প্রভাবশালীরা খালটি ভরাট ও দখল করে নিলে সেখানে সড়ক ও মানুষের বসার জায়গা করে দেয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। কিন্তু জায়গাটি পরবর্তীতে কিশোর অপরাধী ও মাদক ব্যবসায়ীদের আড্ডাস্থলে পরিনত হয়।
র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এলাকাটির বেশ কয়েকটি জায়গায় মাদকের স্পট রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ভূমিকার অংশ হিসেবে মাদকের স্পট ও বিক্রেতাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। মাদক ব্যবসায়ীরা র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালিয়েছে।
ঘটনার পর বিপুল সংখ্যক র্যাব ও পুলিশের সদস্যরা আশপাশের এলাকায় অভিযান চালান। কিন্তু কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিনা তা জানাননি র্যাব অধিনায়ক।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা কোনো ডেভেলপমেন্ট পেলে আপনাদের জানাব। কিন্তু মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলে অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে অস্ত্র মামলায় পরোয়ানাভুক্ত আসামি যুবদল নেতা শামীম মিয়াকে গ্রেপ্তারে অভিযানে যায় পুলিশ। এ সময় যুবদল নেতার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের বাধার মুখে পড়ে পুলিশ।
পরে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলেও জানান রূপগঞ্জ থানার ওসি মো. আলাউদ্দিন।
হামলায় তিনি ছাড়াও আরও ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন বলে জানান ওসি।
হামলার সময় পুলিশের একটি ওয়াকিটকি ও দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। যদিও পরে ওয়াকিটকিটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
আসামি শামীম মিয়া রূপগঞ্জ থানা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে সন্ত্রাস ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রকের অভিযোগ ওঠে।
পুলিশের উপর হামলার ঘটনা জানাজানি হবার পর এদিন বিকালে শামীম মিয়াকে বহিষ্কার করে সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠায় কেন্দ্রীয় যুবদল।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “বহিষ্কৃতদের কোনো অপকর্মের দায়-দায়িত্ব দল নিবে না। যুবদলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হলো।”
একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছে যুবদল।
যদিও হামলার ঘটনার পর পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে শামীমের স্ত্রীসহ অন্তত ১২ জনকে আটক করা হয়। পরে পুলিশ বাদী হয়ে হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে থানায় একটি মামলা করে।
নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (‘গ’ সার্কেল) মেহেদী ইসলাম বলেন, “শামীম মিয়াকে তার ঘর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিবারের সদস্যরা শামীমের সহযোগীদের খবর দিলে তারা পুলিশ সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখে। এক পর্যায়ে শামীম পালিয়ে যান।” ঘটনার পর থেকে শামীমকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি।










