আমার দোষ কী ছিল?’

ভারতের প্রশ্নপত্র ফাঁসে যেভাবে ঝরে গেল একঝাঁক তরুণ প্রাণ

যোগাযোগ ডেস্ক:

ভারতে মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’ (NEET)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ও পরীক্ষা বাতিলের জেরে অন্তত ২১ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার মর্মান্তিক খবর পাওয়া গেছে। পরীক্ষা বাতিলের পর পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে জীবনপ্রদীপ নিভে যায় এসব মেধাবী তরুণদের। এই মর্মান্তিক মৃত্যুগুলোকে কেন্দ্র করে গত জুলাই মাসে ভারতের দিল্লিতে তরুণ শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন এক গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, যার মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন দুজন তরুণের করুণ গল্প, যাদের মৃত্যুর নেপথ্যে ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই অনিয়ম।

কাহান প্যাটেল: মেধাবী তরুণের না বলা অভিমান
আহমেদাবাদের ১৭ বছর বয়সী তরুণ কাহান প্যাটেল। পড়ালেখার পাশাপাশি ফুটবল, গিটার আর বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর বইপ্রেমী এই তরুণের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়া। মে মাসে অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার পর যখন বন্ধুদের নিয়ে আনন্দে মেতে ছিলেন, ঠিক তখনই আসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর।

পরীক্ষা বাতিল হয়ে আবার হবে এমন ঘোষণা আসলে ভেঙে পড়েন কাহান। ক্ষোভ ও হতাশায় বাবাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “এটা কেমন পদ্ধতি? যারা সততার সঙ্গে পরীক্ষা দিল তাদের দোষ কী? সরকার কেন এটাকে এত হালকাভাবে নিচ্ছে?”

পুনঃপরীক্ষার ঠিক তিন দিন আগে, গত ১৮ জুন নিজের অ্যাপার্টমেন্টের ৬ষ্ঠ তলা থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন কাহান। ঘর জুড়ে তখনও ছড়িয়ে ছিল তার নোটবই, খোলা ল্যাপটপ আর গিটার। একটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিমেষেই কা কেড়ে নিল এক সম্ভাবনাময় তরুণের প্রাণ।

প্রদীপ কুমার: এক কৃষকের স্বপ্নভঙ্গ
রাজস্থানের ঝুনঝুনু জেলার ২৩ বছরের প্রদীপ কুমারের গল্পটি আরও করুণ। দরিদ্র কৃষক বাবা নিজের জমি বিক্রি করে এবং ১০ লাখ রুপির বেশি ব্যাংক ঋণ নিয়ে ছেলেকে কোচিংয়ে পাঠিয়েছিলেন ডাক্তার বানানোর উদ্দেশ্যে। প্রদীপ এতটাই পড়াশোনায় মগ্ন ছিলেন যে নিজের কোনো মোবাইল ফোনও কেনেননি।

মে মাসের পরীক্ষায় ভালো করার পর যখন পুরো পরিবার উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর তাদের স্বপ্নে ধাক্কা দেয়। টানা চার বছর ধরে দিনে ১৬ ঘণ্টা পরিশ্রম করা প্রদীপ আর এই অন্যায় মেনে নিতে পারেননি। ১৫ মে নিজের ঘরে আত্মহত্যা করেন তিনি। প্রদীপের বাবা আকুল কণ্ঠে বলেন, “যাদের টাকা আছে তারা প্রশ্ন কিনে নেয়, আর যারা সৎভাবে পড়ে তারা পেছনে পড়ে থাকে। প্রশ্ন ফাঁস না হলে আজ আমার ছেলে বেঁচে থাকত।”

শিক্ষার্থীদের তোপ ও রাজনৈতিক পরিণতি
এই আত্মহত্যার ঘটনাগুলো ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার চরম ভঙ্গুরতা প্রকাশ করে দেয়। ‘কাকরোজ জনতা পার্টি’ (CJP)-র ব্যানারে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসে। দিল্লির রাস্তায় তাদের টানা বিক্ষোভ এবং দাবির মুখে বাধ্য হয়ে ২৫ জুলাই পদত্যাগ করেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

কাহানের বাবা প্রশান্ত প্যাটেল নিজেই দিল্লিতে গিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমার ছেলে নিজের ক্ষোভের কথা বলতে পারেনি, সে নিজেকে শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু আজ এই ছেলেমেয়েরা সোচ্চার হয়েছে। আমাদের দায়িত্ব—তরুণরা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই তাদের মনের কথাগুলো শোনা।”

ভারতে বারবার পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অব্যবস্থা এখন শুধু লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চিত করছে না, বরং তা পরিণত হয়েছে জীবন-মরণের সংকটে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ