সঙ্গীর খোঁজে ৪ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিল তিন বন্য কুকুর

অনলাইন ডেস্ক :

সঙ্গীর খোঁজে আফ্রিকার বন্য কুকুরের তিন ভাই পাড়ি দিয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪৮৫ মাইল বা ৪ হাজার কিলোমিটার পথ। আফ্রিকার কোনো স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণীর সঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রে এটিই এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা দীর্ঘতম পথ বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
জাম্বিয়ার দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড পেরিয়ে আট মাস ধরে এই যাত্রা করে তিন ভাই। সরলরেখায় তাদের অতিক্রম করা দূরত্ব ছিল প্রায় ২৬০ মাইল (৪১৮ কিলোমিটার)। কিন্তু মানুষের বসতি, সড়ক ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে ঘুরে ঘুরে চলায় মোট দূরত্ব দাঁড়ায় প্রায় ১০ গুণ।
গবেষকদের মতে, এই ঘটনা আশার কথা শোনালেও বন্য কুকুরগুলোর জন্য বিপদের দিকটিও স্পষ্ট হয়েছে। গবেষণায় জিপিএস কলার পরানো অন্য কয়েকটি বন্য কুকুর অবৈধ ফাঁদে পড়ে মারা গেছে। একই ধরনের দীর্ঘ যাত্রায় থাকা তিন বোনের মধ্যে দুটিও মারা যায়। তাদের একজন ফাঁদে আটকা পড়ার পর যাত্রা থেমে যায়।

আফ্রিকান বন্য কুকুর আফ্রিকার সবচেয়ে দুর্লভ শিকারি প্রাণীগুলোর একটি। বর্তমানে বন্য পরিবেশে এদের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার বলে ধারণা করা হয়। তারা অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী এবং দলবদ্ধভাবে বসবাস ও শিকার করে। নতুন এলাকা ও প্রজননের সুযোগের সন্ধানে তারা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্যও পরিচিত।
বন্য কুকুর নিজেদের জন্মদল বা প্যাকের সদস্যদের সঙ্গে প্রজনন করতে পারে না। ফলে প্রায় দুই থেকে তিন বছর বয়সে তারা নতুন সঙ্গী ও প্রজননের সুযোগের সন্ধানে দল ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। প্রাণিবিদ্যায় এই একমুখী যাত্রাকে ‘ডিসপারসাল’ বলা হয়। এটি মৌসুমি খাদ্য বা বাসস্থানের সন্ধানে প্রাণীদের যাতায়াতের ‘মাইগ্রেশন’ বা পরিযান থেকে আলাদা।

গবেষণায় দেখা গেছে, তিন ভাইয়ের যাত্রাপথ শুধু দীর্ঘই ছিল না, বরং তারা এমন একটি ভূখণ্ড অতিক্রম করেছে যা মানুষের কর্মকাণ্ডে ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। তারা জাম্বিয়ার বিভিন্ন বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও নিরাপদ এলাকার মধ্যে চলাচল করেছে এবং রাজধানী লুসাকা ও শিল্পাঞ্চলের মতো বড় মানববসতি এড়িয়ে গেছে।
গবেষকদের মতে, এই তথ্য পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার বন্য কুকুরের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী সম্পর্কে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। এর মাধ্যমে ধারণা করা হচ্ছে, বেড়া দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা হয়নি এমন বড় বন্য কুকুরের জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এখনও যোগাযোগ থাকতে পারে।
মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্কট ক্রিল গবেষণাটির প্রধান লেখক। ১৯৯১ সাল থেকে আফ্রিকান বন্য কুকুর নিয়ে কাজ করা এই গবেষক বলেন, পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় সব বড় বন্য কুকুরের জনগোষ্ঠীই সম্ভবত পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে একই সঙ্গে আশাব্যঞ্জক ও উদ্বেগজনক দুইভাবেই দেখতে হবে। বিশেষ করে শিকারিদের ব্যবহৃত অবৈধ ফাঁদ বন্য কুকুরের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব বন্য কুকুরের সঙ্গীরা মারা গেছে, তাদের জীবিত সদস্যরা বারবার একই স্থানে ফিরে এসেছে। গবেষকদের মতে, কোনো সঙ্গী মারা গেলে বেঁচে থাকা সদস্যদের এমন আচরণ দেখা যেতে পারে।
জার্নাল ইকোলজিতে প্রকাশিত গবেষণাটিতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোর মধ্যে প্রাকৃতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বা ‘ওয়াইল্ডলাইফ করিডর’ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, সড়ক, শহর ও কৃষিজমির কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলগুলোর মধ্যে এমন প্রাকৃতিক পথ তৈরি করা প্রয়োজন।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন দ্য নেচার কনজারভেন্সির কাফুয়ে কনজারভেশন প্রকল্পের পরিচালক ও গবেষণাটির সহলেখক ব্রুস এলেন্ডারের মতে, বন্য কুকুর ও হাতির মতো বিস্তৃত এলাকায় বিচরণকারী প্রাণীদের টিকে থাকার জন্য সংযুক্ত প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted