শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত রোমহর্ষক সাক্ষ্য দিয়েছেন র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী।
সুন্দরবনে ২০১১ ও ২০১২ সালে জিয়াউল আহসানের পরিচালিত ৩টি ‘সাজানো’ অভিযানের তথ্যও উঠে এসেছে সাবেক এ র্যাব কর্মকর্তার জবানবন্দিতে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি সেসব ঘটনার চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। জবানবন্দিতে মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী জানান, ২০১০ সালের মে মাসে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলামসহ চারজনকে এবং বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সরকারের সমালোচক হিসেবে চিহ্নিত অন্তত ১৫ জনকে গুলি করে হত্যার পর পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এসব হত্যাকাণ্ডকে জিয়াউল আহসান সাংকেতিক ভাষায় বলতেন ‘গলফ অপারেশন’। মামলার একমাত্র আসামি সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক ও র্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিচালক জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
জবানবন্দি গ্রহণের পরে চিফ প্রসিকিউটর মো.আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, জিয়াউল আহসানের দ্বারা সংগঠিত এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন মেজর (অব.) সাব্বির। আর তার এই জবানবন্দিই জিয়াউলের অপরাধ প্রমাণে যথেষ্ট বলে মনে করেন তিনি।
জবানবন্দিতে মেজর সাব্বির জানান, ১৯৯৩ সালে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া কোরে কমিশন পাওয়ার পর ২০০৯ সালে র্যাবে বদলি হন তিনি। প্রথমে র্যাব-২ এবং পরে র্যাব-৮-এর উপ-অধিনায়ক হিসেবে বরিশালে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান। তার দাবি, জিয়াউল আহসান বিভিন্ন সময় র্যাব-৮-এর অধিনায়ক ও তাকে সরাসরি ফোন করে বিভিন্ন আভিযানিক নির্দেশনা দিতেন।
জবানবন্দিতে সুন্দরবনকেন্দ্রিক আরও ৩টি অভিযানের বর্ণনা দেন মেজর সাব্বির। তার দাবি, ২০১১ সালের নভেম্বরে নিশানখালী, ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কটকা এবং একই বছরের মার্চে মরা ভোলা এলাকায় এসব অভিযান পরিচালিত হয়।
নিশানখালীর অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, মূল অভিযান শুরুর আগেই গোয়েন্দা শাখার একটি দল ঘটনাস্থলে চলে যায়। মূল দল সেখানে পৌঁছে এলাকা ঘেরাও করার সময় বনের ভেতর থেকে হুইসেলের শব্দ শোনা যায়।
তার দাবি, ওই শব্দ ছিল গোয়েন্দা সদস্যদের সংকেত। এরপর জিয়াউল আহসানের নির্দেশে বন লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। পরে তল্লাশি চালিয়ে দুটি লাশ উদ্ধারের কথা বলা হলেও মামলার সময় ছয়টি লাশ দেখানো হয় বলে দাবি করেন সাক্ষী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত চারটি লাশ গোয়েন্দা শাখার অগ্রগামী সদস্যরা আগে থেকেই ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং জিয়াউল আহসানের নির্দেশে তাদের হত্যা করে মূল অভিযানের সঙ্গে দেখানো হয়।
কটকার অভিযানের বিষয়ে সাব্বির বলেন, পাঁচজন হাত বাঁধা ব্যক্তিকে ট্রলারে তোলা হয়। তাদের মধ্যে চারজনকে মোহনার কাছে নিয়ে গিয়ে একই কায়দায় হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। পঞ্চম ব্যক্তিকে পরে বনের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর বন থেকে গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে অভিযানে ৪টি লাশ উদ্ধারের কথা বলা হয়।
তার ধারণা, অজ্ঞাত হিসেবে থাকা লাশটি ওই পঞ্চম ব্যক্তির। মরা ভোলার অভিযানের বর্ণনায় তিনি বলেন, মূল অভিযানের আগে গোয়েন্দা শাখার সদস্যদের একটি দল সেখানে যায়। পরে মূল দল পৌঁছালে বন লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। তল্লাশির পর ৫টি লাশ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের কথা বলা হয়। তার দাবি, এই ৩টি অভিযানই ছিল সাজানো।
এদিকে সাক্ষীর জবানবন্দি শেষে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, জিয়াউল হাসানের মামলায় সাক্ষীর সাক্ষ্য থেকে অভিযানের ধরন, ভিকটিমদের হত্যা এবং লাশ গুম করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
তার দাবি, আসামির সঙ্গে সাক্ষীর ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না; বরং তিনি একই বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন এবং অনুশোচনা থেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর তার সাক্ষীর ওপর ভিত্তি করে আমার মনে হয় যে, জিয়াউল হাসানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষের, সেটি প্রমাণের জন্য যথেষ্ট সহায়ক।-কালবেলা










