পুরোহিত হন্তদন্ত হয়ে মন্ত্র পড়ছিলেন আর অগ্নিকুণ্ডে একটার পর একটা ‘স্বহা, স্বহা’ শব্দে আহুতি দিচ্ছিলেন। ওদিকে মেটা চান চেষ্টা করছিলেন তার কান্নাকাটি করা তিন সন্তানের একজনকে ফোনের স্ক্রিনে ইউটিউব চালিয়ে শান্ত রাখতে। আগুনের ধোঁয়ায় তার চোখ জ্বলছিল। বারবার তিনি একবার সন্তানদের দিকে তাকাচ্ছিলেন, আবার ফিরে তাকাচ্ছিলেন যজ্ঞের আগুনের দিকে। গ্যাংস্টার মাইনপাল ধিল্লার দুই হাত একটা বড় কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল—খুব সম্ভবত তার হাতের হাতকড়াটা ঢেকে রাখার জন্যই এই ব্যবস্থা। তবুও কাপড়ের ফাঁক গলে মাঝে মাঝেই ঝিকমিক করে উঠছিল ধাতব হাতকড়াটি। কেউ খেয়াল করতেই আবার চট করে কাপড় দিয়ে সেটা ঢেকে দেওয়া হচ্ছিল।
মণ্ডপের চারপাশে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ সদস্যরা কড়া নজরদারি চালাচ্ছিলেন। অদূরেই বরের নারী আত্মীয়রা নারী কনস্টেবলদের সঙ্গে গল্পে মেতেছিলেন আর কনের লেহেঙ্গাটা ঘুরেফিরে দেখছিলেন।
‘কনের লেহেঙ্গাটা কিন্তু একদম গায়ে মানায়নি,’ এক নারী কনস্টেবল মন্তব্য করলেন। ‘আমি শুনেছি এটার দাম নাকি ছয় হাজার রুপি,’ পাশ থেকে উত্তর দিলেন আরেক কনস্টেবল।
সত্যিই এক অদ্ভুত ও তাড়াহুড়োর বিয়ে! ধিল্লাকে যে অন্য জায়গায় ফিরতে হবে—তার আসল ঠিকানা এখন কারাগার।
৫০ বছর বয়সি ভারতের হরিয়ানার এই গ্যাংস্টারকে তার ৩৭ বছর বয়সি কম্বোডিয়ান প্রেমিকা মেটাকে বিয়ে করার জন্য বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত—মাত্র ১২ ঘণ্টার জন্য কাস্টডি প্যারোল দেওয়া হয়েছিল। মেটা তার তিন সন্তানকে নিয়ে ঝাজ্জারে এসেছেন, তবে পরিবারের অন্য কোনো সদস্য তার সঙ্গে ছিলেন না।
ধিল্লা মূলত বাদলি গ্রামের এক ট্রাক্টর মেকানিক ছিলেন। ২০০০ সালে গ্রামের ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে বিরোধের জেরে নিজের চাচা হেমচন্দ্রকে হত্যা করার পর থেকে পুলিশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় তার নাম ওঠে। পরবর্তীতে তিনি নিজের মামা ওমপ্রকাশকেও হত্যা করেন এবং দ্রুতই ওই এলাকার কুখ্যাত অপরাধী হয়ে ওঠেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি আরও দুজনকে হত্যা করেছেন এবং বর্তমানে তার বিরুদ্ধে অন্তত ২২টি অপরাধমূলক মামলা রয়েছে। হত্যা, হত্যাচেষ্টা, ডাকাতি, ছিনতাই, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও অবৈধ অস্ত্র মামলার মতো নানা অপরাধে তিনি এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
বাদলি গ্রাম থেকে আসা ধিল্লার আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসী যখন মণ্ডপ ঘিরে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন প্রায় ১৫ জন সশস্ত্র পুলিশ সদস্য চারপাশ পাহারা দিচ্ছিলেন। পুলিশ সদস্যদের জন্য এই বিয়ের একটাই কড়া শর্ত ছিল- রাত ৮টার মধ্যে ধিল্লাকে আবার জেলখানায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
কৃত্রিম ফুল দিয়ে সাজানো একটা অস্থায়ী ঘরেই বানানো হয়েছিল বিয়ের মণ্ডপ। একপাশে পুরুষদের বসার জন্য সারি সারি চেয়ার সাজানো ছিল, আর নারীরা বসেছিলেন কাছেই মাটিতে। ছোট সেই ঘরটিতে শুধু ধিল্লা, মেটা, তাদের সন্তান এবং পণ্ডিতের দাঁড়ানোর মতো জায়গা ছিল। তাদের ঘিরে চারজন বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা ও বন্দুকধারী পুলিশ কর্মকর্তা পুরো আনুষ্ঠানিকতার ওপর নজর রাখছিলেন।
পুলিশের কড়া পাহারায় বিয়ে
গুড়গাঁও-ঝাজ্জার সড়কের পাশের ওই ফার্মহাউসের বাইরে প্রায় ৫০টির মতো গাড়ি পার্ক করা ছিল—যার মধ্যে রয়েছে এসইউভি, স্করপিও এবং থার। তবে বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে ভেতরে কোনো বিয়ের আয়োজন চলছে। বাইরের দিকে কোনো আলোকসজ্জা বা সাজসজ্জা ছিল না। তার বদলে গেটে পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে ও বসে থেকে আগত অতিথিদের ওপর নজর রাখছিলেন।
প্রবেশদ্বারে পুলিশ সদস্যরা প্রত্যেকের ব্যাগ তল্লাশি করছিলেন, গায়ে হাত দিয়ে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে চেক করছিলেন এবং নাম, বাবার নাম ও ফোন নম্বর লিখে রাখছিলেন। গণমাধ্যমকর্মীদের ভেতরে ঢোকার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ভেতরে গোলাপি ও সাদা রঙের তাঁবুতে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ফাঁকা জায়গায় চেয়ারে বসে পুরুষেরা খাবার খাচ্ছিলেন আর বিড়ি টানছিলেন, আর নারীরা যাতায়াত করছিলেন ঘর ও বিয়ের আয়োজনের জায়গায়।
স্যুট পরা নারীরা একসঙ্গে ফার্মহাউসের ভেতরে বসে নিজেদের মধ্যে এবং নারী কনস্টেবলদের সঙ্গে গল্প করছিলেন। কোনো বলিউডের গান বাজছিল না, এমনকি হরিয়ানার বিয়ের প্রথা ভেঙে নারীরা কোনো ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গীতও গাইছিলেন না।










