খুলনায় প্রাথমিকের নিয়োগপত্র পায়নি ৬৯ জন

‘ছেলের চাকরি না হলে আমাকে খাওয়াবে কে?’

যোগাযোগ ডেস্ক :

খুলনায় প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র পাননি ৬৯ জন। এর মধ্যে একজন পাইকগাছা উপজেলার ভিক্টর বৈরাগী। ছেলে নিয়োগপত্র না পাওয়ায় শনিবার সকালে জেলা শিক্ষা অফিসে আসেন ভিক্টর বৈরাগীর মা বিউটি রানী বৈরাগী।
বিউটি রানী বৈরাগী জানান, ২০১৪ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি ও অন্যের বাসায় রাঁধুনির কাজ করে দুই ছেলেকে বড় করেছেন তিনি। বড় ছেলে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উপজেলায় ১৭তম হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে আসেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার জানতে পারেন বড় ছেলে ভিক্টর বৈরাগীকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। কারণ জানতে আজ শনিবার ভোরে পাইকগাছা থেকে রওনা দিয়ে ৬৫ কিলোমিটার দূরের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে পৌঁছান তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসেই দেখা হয় বিউটি রানীর সঙ্গে। সমকালকে তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্টে ছেলে দুটিকে মানুষ করেছি। এখন আগের মতো কাজ করতে পারি না। ছেলের চাকরি হওয়ায় আমি গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে আসছি। এখন ওর যদি চাকরি না হয়, ছোটটার লেখাপড়ার খরচ কে দেবে? আমাকে খাওয়াবে কে? আমার তো মরা ছাড়া উপায় থাকবে না।’
কথা বলতে বলতে বিউটি রানীর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। কিছু সময় চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করেন, ‘আমার অল্প বেতনের টাকা আর নিজেরা টিউশনি করে ওরা বড় হয়েছে। রাজনীতি করার মতো অবস্থাও আমাদের না। আমার পরিবারের কেউ কোনো দিন রাজনীতি করেনি। আমার ছেলেকে কোন বিবেচনায় বাদ দিল—জানতে চাই।’
বিউটি রানীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে শিক্ষা অফিস চত্বরে পৌঁছান খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার সুদীপ্ত ও সৈকত মণ্ডল, রূপসার হায়দার আলী, তেরখাদার মুকুল আহমেদ, দাকোপ উপজেলার ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলসহ আরও ১০-১২ জন নিয়োগপ্রার্থী। এর মধ্যে সুদীপ্ত মেধাক্রমে চতুর্থ, হায়দার পঞ্চম ও মুকুল ষষ্ঠ স্থান লাভ করেন। সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। কিন্তু অন্যরা নিয়োগপত্র পেলেও তারা পাননি। কারণ জানতে তারাও এসেছেন প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে জানা গেছে, গত বছর সহকারী শিক্ষক পদের জন্য খুলনায় ২৪ হাজার ৩৭১ জন আবেদন করেন। চলতি বছর ৯ জানুয়ারি তাদের লিখিত পরীক্ষা ও পরে মৌখিক পরীক্ষা শেষে গত ৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হয়। খুলনা জেলায় ২৭৫ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে ২৬৫ জন চাকরির জন্য কাগজপত্র জমা দেন। গত বৃহস্পতিবার তাদের মধ্যে ১৯৬ জনকে নিয়োগপত্র দিয়ে চাকরিতে যোগ দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু সুপারিশ পাওয়া ৬৯ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদন এবং ঠিকানাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি। প্রত্যেকের নিয়োগ না পাওয়ার কারণ ভিন্ন। এ জন্য কে কোন কারণে নিয়োগ পাননি, তা বের করা সম্ভব নয়।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় মেধাক্রমে দ্বিতীয় হয়েছেন বহ্নি মল্লিক। কিন্তু চূড়ান্ত নিয়োগে বাদ পড়েছেন তিনি। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে পাস করা বহ্নির বাড়ি লতা ইউনিয়নের আসাননগর গ্রামে।
সমকালকে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে বসে ডিএসবির (জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা) লোক চারজনের কাগজপত্র দেখে গেছে। ওই তিনজনের চাকরি হয়েছে, কিন্তু আমার হয়নি। আমার একাডেমিক কাগজপত্রে কোনো সমস্যা নেই, আমার চৌদ্দগোষ্ঠীতে কেউ রাজনীতি করে না, পরিবারের কারও নামে ফৌজদারি মামলা নেই; তারপরও কেন আমার নিয়োগপত্র আসেনি, আমি জানতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘চাকরি নিয়ে আমার দুঃখ নেই, কিন্তু কেন আমাকে বাদ দেওয়া হলো আমি জানতে চাই। কারণ প্রতিটি চাকরির ক্ষেত্রেই তো রিপোর্ট যাবে, কী কারণে আমি চাকরি পাব না, তা জানা তো আমার অধিকার।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাইকগাছা উপজেলায় ৪৬ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও নিয়োগপত্র পেয়েছেন ২৬ জন। ১৯ জন প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি।
ডুমুরিয়ায় মেধাক্রমে চতুর্থ হওয়া সুদীপ্ত মণ্ডল বলেন, ‘ডিএসবির লোক বাড়িতে বসে কথা বলেছে। এনএসআইয়ের (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা) এক কর্মকর্তা ইউনিয়ন পরিষদে বসে আমার কাগজপত্র নিয়েছেন। অযোগ্যতার কোনো শর্ত আমার ভেতর নেই। কেন নিয়োগ পেলাম না, তা জানতে শিক্ষা অফিসে এসেছি।’
নিয়োগবঞ্চিতদের সঙ্গে কথা বলার সময় কার্যালয়ে আসেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম। তাদের ডেকে তিনি বলেন, ‘কেউ নিয়োগবঞ্চিত হয়নি। কেউ আগে পেয়েছে, কেউ পরে পাবে। যারা নিয়োগপত্র পাননি, তাদের বিষয়টি মহাপরিচালকের দপ্তরে জানানো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুত ব্যবস্থা হবে।’
সেখান থেকে ফেরার পথে বিউটি রানী আবার ছুটে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের চাকরির বয়স শেষ। এটাই শেষ সুযোগ। আমাদের কথা একটু বলেন। সবাই চুপ হয়ে থাকলে আমরা কোথায় যাব?’
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘কোনো অপরাধমূলক কাজের রেকর্ড থাকলে তা বিবেচনা করা উচিত, কিন্তু কেবল ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের কারণে কাউকে বাদ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি যোগ্য ও দক্ষ জনবল থেকে রাষ্ট্রকে বঞ্চিত করে। ছাত্র-জনতার এত রক্তের পরও এ সংস্কৃতি চালু থাকা লজ্জাজনক।’-সমকাল

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ