সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী দুলাল মিয়ার বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় নারী, শিশুসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।
একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মামুদ আলীর ছেলে দুলাল মিয়া ওই হামলার পর থেকে নিখোঁজ বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবারটির সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে দেশি অস্ত্র নিয়ে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল দুলাল মিয়ার বাড়ি ও দোকানে হামলা চালায়। এ সময় ঘর ও দোকান ভাঙচুর করা হয়। লুট করা হয় নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, গরু, ফ্রিজসহ বিভিন্ন মালপত্র। হামলার সময় দুলাল বাড়িতে ছিলেন না।
দুলাল মিয়ার জামাতা হেলাল মিয়া সমকালকে বলেন, ওই হামলার সময় তিনি সুনামগঞ্জে ছিলেন। হামলার খবর পেয়ে গ্রামের বাড়ি যান। গিয়ে দেখেন টিনের ঘরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়েছে। দোকানের মালপত্র লুট হওয়া অবস্থায় দেখতে পান। তাঁর অভিযোগ, হামলাকারীরা চারটি ফ্রিজ, ছয়টি গরু, দুই ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ চার লাখ টাকা নিয়ে গেছে।
হেলাল মিয়ার অভিযোগ, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি তোতা টেইলার্সের ভাতিজা জালাল মিয়ার নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর সঙ্গে তোফাজ্জল মিয়া, শাহিন মিয়া, হেকিম মোড়ল, সুলতান, রাজ্জাক, তারেক, শামীম, নূর ইসলামসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। হামলার সময় পরিবারের নারী সদস্যদের মারধর ও যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হেলাল জানান, তাঁর দাদা শ্বশুর মামুদ আলী মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারটির সাত সদস্য ও আত্মীয় শহীদ হয়েছিলেন। দুলাল মিয়ার মেয়ে উজ্জ্বলা আক্তার বলেন, তাঁর বাবা ২০১৬ সালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে তারা আতঙ্কে ছিলেন।
উজ্জ্বলা জানান, তাঁর বাবা দুলাল মিয়া ও স্বামী হেলাল মিয়া মিলে গ্রামে দোকান চালাতেন। সম্প্রতি তাদের দোকান বন্ধ রাখার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। পরে তারা পুলিশের কাছে দোকান খোলার বিষয়ে সহায়তা চান। গত বৃহস্পতিবার পুলিশ গ্রামে গিয়ে তদন্ত করে দোকান খোলার বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করে। এর পর তারা দোকান খোলেন। ওই রাতেই হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দৌলতপুর গ্রামের তোতা টেইলার্স, জলিল মিয়াসহ পাঁচজনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে একাত্তরে ৩৪ জনকে হত্যা, পাঁচ নারীকে ধর্ষণ, ৩১ জনকে অপহরণ, ১৪ জনকে নির্যাতন এবং ৩০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর তারা জামিনে মুক্তি পান। এর পর থেকে তাদের স্বজনা আসামিপক্ষের লোকজনকে নানাভাবে ভয় দেখিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই মামলায় দুলাল মিয়াসহ তখন তদন্ত সংস্থার কাছে মোট ৩২ জন সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা মোট ১৫০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন দেয়।
দুলাল মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বেগম সমকালকে বলেন, আসামিপক্ষের লোকজন প্রভাবশালী। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার রাতের হামলায় বাড়ির সবকিছু লুট করে নেওয়া হয়েছে। এখন তাঁর স্বামীকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় আছেন। তাঁর স্বামী আত্মগোপনে থাকলে তো পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগ করতেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, আসামিপক্ষ স্থানীয়ভাবে অনেক বেশি প্রভাবশালী। এ কারণে সাক্ষীদের অনেকেই ভয়ে আতঙ্কে গ্রামছাড়া। তারা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মোকতাদির আহমদ জানান, দৌলতপুর গ্রামের তিন নারী ও এক শিশু আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে জালাল মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ধরেননি।
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে হামলা ও ভাঙচুরের আলামত সংগ্রহ করেছে। ভুক্তভোগীদের মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আহত ব্যক্তিদের নিয়ে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে থাকায় মামলা করতে দেরি হচ্ছে।
জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। খোঁজখবর নিয়ে দেখবেন। -সমকাল









