বর্তমান ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে উত্তপ্ত প্রশ্নটি হলো—ইরান কি শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পথে হাঁটবে? গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের ভয়াবহ সংঘাত এবং সম্প্রতি এপ্রিলের এই নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তবে বাস্তবতা বলছে, ইরান পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের চেয়ে সেটি ‘তৈরি করার সক্ষমতা’ অর্জন করতেই বেশি আগ্রহী।
বাস্তবতা হলো, পারমাণবিক অস্ত্র কোনো সাধারণ যুদ্ধাস্ত্র নয়; এটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। ইরান খুব ভালো করেই জানে যে একবার যদি তারা এই অস্ত্র ব্যবহার করে, তবে সেটি হবে তাদের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এবং মানচিত্রের চূড়ান্ত সমাপ্তি।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল পারমাণবিক ও সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে একটি পারমাণবিক হামলা চালানো মানেই হলো পাল্টা ধ্বংসাত্মক হামলার আমন্ত্রণ জানানো, যাকে সমরবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘মিউচুয়ালি অ্যাসিউরড ডেসট্রাকশন’ বা পারস্পরিক নিশ্চিত বিনাশ। তেহরান সম্ভবত এই আত্মঘাতী ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
তবে কেন তারা পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে এত ঝুঁকছে? এর মূল কারণ হলো ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধ। ইরান চায় না ইরাক বা লিবিয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে। তারা মনে করে, হাতে পারমাণবিক সক্ষমতা থাকলে ওয়াশিংটন বা তেল আবিব সরাসরি তাদের ভূখণ্ডে বড় ধরনের অভিযান চালানোর আগে দশবার ভাববে। অর্থাৎ, বোমাটি ফাটানোর জন্য নয়, বরং শত্রু যেন আক্রমণ করতে সাহস না পায়—সেই বর্ম হিসেবেই তারা এটিকে দেখছে।
অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে ফেব্রুয়ারির হামলায় সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণের পর ইরানের নতুন নেতৃত্ব হয়তো আরও উগ্র হতে পারে। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি তাদের হাত পা অনেকটাই বেঁধে রেখেছে। এই মুহূর্তে একটি পূর্ণমাত্রার পারমাণবিক যুদ্ধ মানেই দেশ হিসেবে ইরানের চিরতরে পতন।
পরিশেষে বলা যায়, ইরান পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের পথে হাঁটার সম্ভাবনা এই মুহূর্তে খুবই কম। তারা বরং এই সক্ষমতাকে আলোচনার টেবিলে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং শাসনব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চাইবে। বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধিও সেই কূটনৈতিক দরকষাকষিরই একটি অংশ।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে হুঙ্কার দেবে ঠিকই, কিন্তু চূড়ান্ত ধ্বংসের বোতামে চাপ দেওয়ার মতো হঠকারিতা দেখানোর সম্ভাবনা বাস্তবসম্মত নয়।
-যুগান্তর









