রবিবার | ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ | ৬ বৈশাখ, ১৪৩৩ | ১ জিলকদ, ১৪৪৭

ঢাকার বুকে মোহাম্মদপুর যেন ‘অপরাধের রাজধানী’

অনলাইন ডেস্ক :

ফাইল ছবি

 

রাজধানীর মানচিত্রে মোহাম্মদপুর একটি পরিচিত আবাসিক এলাকা। কিন্তু বাস্তবে যেন আরেকটি ভিন্ন শহর। দিন নেই, রাত নেই, সর্বত্র এক নীরব আতঙ্ক ছড়িয়ে আছে। গভীর রাতে ছিনতাইয়ের খবর, মাঝেমধ্যেই রক্তাক্ত সংঘর্ষ কিংবা হত্যাকাণ্ড। সব মিলিয়ে অনেকের কাছে মোহাম্মদপুর যেন ‘ঢাকার বুকে যেন অপরাধের আলাদা এক ভূখণ্ড। স্থানীয়দের দাবি, এখানে অপরাধ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা সংগঠিত অপরাধ নেটওয়ার্কই এলাকাটির নতুন পরিচয় তৈরি করেছে।

প্রতিদিনই চুরি, ছিনতাই, মাদক বাণিজ্যসহ নানা কারণে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের খবর আসছে এই থানা এলাকা থেকে। কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাসী গ্রুপ ও প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে মোহাম্মদপুর ক্রমেই পরিণত হচ্ছে সহিংসতার স্থায়ী মঞ্চে। মাত্র কয়েকশ’ মিটারের ব্যবধানে গত কয়েক দিনে ধারাবাহিক দুই হত্যাকাণ্ড নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, রাজধানীর মাঝেই কি তৈরি হয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন অপরাধের আলাদা এক ভূখণ্ড?

মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাসী গ্রুপ এবং নানা ধরনের অপরাধ চক্র সক্রিয় রয়েছে, এমন অভিযোগ স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন গ্রুপের আলাদা নেতৃত্ব রয়েছে, যারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। প্রকাশ্যেই অস্ত্রের মহড়া, সহিংসতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে এসব গ্রুপ।

এই ধারাবাহিক সহিংসতার অংশ হিসেবে গত ১৫ এপ্রিল রাতে সাদেক খান ইটভাটার সামনে আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল (২৮) নামের এক তরুণকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে গত ১২ এপ্রিল একই এলাকার রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওই সংঘর্ষে ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর হোতা ইমন ওরফে এলেক্স ইমন নিহত হন। মাত্র ৩০০ মিটারের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এই দুটি হত্যাকাণ্ড এলাকাজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের বিরোধের জেরে ইমন খুন হন। আর আসাদুল নিহত হন নিজ দলের সদস্যদের হাতেই। তিনি মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় র‌্যাব ও পুলিশ পৃথক অভিযান চালিয়ে ছয় জনকে গ্রেফতার করেছে।

মোহাম্মদপুরে অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে ভৌগোলিক অবস্থানকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন দিক থেকে সহজে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ থাকায় অন্য এলাকা থেকে এসে অপরাধ সংঘটিত করে দ্রুত সরে পড়তে পারে অপরাধীরা। এছাড়া আশপাশের থানা এলাকায় সংঘটিত অনেক অপরাধও মোহাম্মদপুরের নামে প্রচারিত হয়। বাস্তব অপরাধের তুলনায় অপপ্রচারও বেশি হয় বলে মনে করেন তারা। পাশাপাশি বিহারিদের আবাসস্থল জেনেভা ক্যাম্প থাকায় এলাকাটি সবসময় আলোচনায় থাকে।

মোহাম্মদপুর থানার এক পুলিশ সদস্য বলেন, “মোহাম্মদপুর থানা এলাকা বড় হলেও থানা একটিই। পাশেই আদাবর থানা। সেখানে কোনও অপরাধ ঘটলেও অনেক সময় মোহাম্মদপুরের নাম আসে। অথচ মিরপুর-পল্লবী এলাকায় তুলনামূলক বেশি অপরাধ ঘটে। যা নিয়ে বিব্রত পুলিশ কর্মকর্তারাও।”

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরে কয়েকটি অপরাধপ্রবণ স্পট রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বসিলা, রায়েরবাজার, ঢাকা উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান এলাকা এবং আটকে পড়া পাকিস্তানিদের জেনেভা ক্যাম্প।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে তুলনামূলক কম খরচে আবাসনের সুযোগ থাকায় অনেক উঠতি অপরাধীর বসতি গড়ে উঠেছে। যানবাহন থেকে চাঁদাবাজি, ফুটপাত দখল এবং মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে এসব অপরাধী চক্র নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়ায়।

এদিকে গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) ভোরে নূরজাহান রোড এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন ফটোগ্রাফার সাঈদ হাসান তানিম। এ ঘটনায় তিনি থানায় অভিযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মোহাম্মদপুর অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার পেছনে তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতির কারণে এখানে অপরাধ পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিয়েছে।”

তার মতে, প্রথমত এলাকাটিতে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে; দ্বিতীয়ত, তুলনামূলক কম খরচে বসবাসের সুযোগ থাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবেও এটি গড়ে উঠেছে। যার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। তৃতীয়ত, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কেউ কেউ যখন আশ্রয়দাতায় পরিণত হন, তখন অপরাধ আরও বিস্তার লাভ করে।

তৌহিদুল হক বলেন, বিশেষ অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এমন আশা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালিত অভিযানে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। মোহাম্মদপুরকে ঘিরে নিরপেক্ষ ও লক্ষ্যভিত্তিক বিশেষ অভিযান প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রচলিত গুরুতর অপরাধগুলোকে জামিন অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা এবং অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলেই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন  বলেন, “আমাদের থানা এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ এবং বিভিন্ন দিক থেকে সহজে যাতায়াত করা যায়। এ কারণে চুরি-ছিনতাইসহ কিছু অপরাধ ঘটে। তবে আমরা সেগুলো নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি।”

তিনি জানান, জনসংখ্যার তুলনায় থানার জনবল কম হলেও নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং অনেক অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিট পুলিশিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান  বলেন, “ঐতিহ্যগতভাবেই মোহাম্মদপুর এলাকায় অপরাধীদের বিচরণ কিছুটা বেশি। এখানে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর দুটি ক্যাম্প, বাস-লেগুনা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড থাকায় ভাসমান মানুষের উপস্থিতি বেশি থাকে।”

তিনি জানান, অনেক অপরাধী মোহাম্মদপুরে অপরাধ সংঘটিত করে গাবতলী বা মিরপুর এলাকায় চলে যায়। আবার ঢাকা উদ্যানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তুরাগ নদী অপরাধীদের পালানোর পথ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অনেক সময় তারা কেরানীগঞ্জ বা আশপাশের এলাকায় অবস্থান করে নদীপথে এসে অপরাধ করে আবার ফিরে যায়। তিনি জানান, নিয়মিত টহল, অভিযান এবং বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে গ্যাং সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে।-বাংলা ট্রিবিউন থেকে নেওয়া

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ