ঘন অন্ধকার রাত। চারপাশটা সুনসান। হঠাৎ সুবিশাল দুর্গের নীরবতা ভেঙে ধেয়ে এলো ২৫ থেকে ৩০ জনের একদল সশস্ত্র লোক। তারা কোনো গুপ্তধন খুঁজতে আসেনি, এসেছে দুর্গের খোলা চত্বরে শত শত বছর ধরে পাহারা দিয়ে রাখা ভারী এক ঐতিহাসিক কামান নিতে। কামানের ওজন এক বা দুই কেজি নয়, পুরো তিন হাজার কেজি!
নিরাপত্তারক্ষীর হাতে থাকা কাঠের লাঠিকে কোণঠাসা করে, বুক লক্ষ্য করে বন্দুক উঁচিয়ে, ক্রেন ও ট্রাক নিয়ে এসে চোখের পলকে তারা গায়েব করে দিলো ১৬ শতকের এক অমূল্য ইতিহাস। ভারতের মধ্য প্রদেশের সুরক্ষিত এই দুর্গ থেকে সিন্ধিয়া আমলের সেই বিশাল কামান চুরির গল্প এখন নেট দুনিয়ায় রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের মধ্যবর্তী রাতে। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি সশস্ত্র দল সেদিন নারওয়ার দুর্গে প্রবেশ করে। দুর্গের উন্মুক্ত কাছারি চত্বরে মোট ১৪টি ঐতিহাসিক কামান সংরক্ষিত ছিল। ডাকাত দল সেখান থেকে একটি কামান লুট করে নিয়ে যায়।
দুর্গের নিরাপত্তা প্রহরীদের অভিযোগ, সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাদের অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখায়। বাধা দিলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। এই চুরির পর দুর্গটিতে আর মাত্র ১৩টি কামান রয়েছে।
আগাম সতর্কবার্তা উপেক্ষা
এই চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো অবহেলা। চুরির প্রায় ১২ দিন আগে থেকেই দুর্গের চারপাশে সন্দেহজনক আনাগোনা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বিষয়টি মোটেও গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। কোনো অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা নজরদারির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সুরক্ষিত এই ঐতিহাসিক জায়গার সার্বিক নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ডাকাত দল অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এসেছিল। তিন হাজার কেজি ওজনের ভারী কামান সরানোর জন্য তারা সঙ্গে করে একটি ক্রেন এবং একটি ট্রাক নিয়ে আসে।
অপরাধীরা দুর্গের পেছনের একটি রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢোকে। এরপর পুরো অভিযান শেষ করে ঐতিহাসিক কামান নিয়ে অনায়াসে পালিয়ে যায়।
ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা প্রহরী বালকিষান নিজের অসহায়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ডাকাত দলের কাছে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। অথচ দুর্গের নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে ছিল মাত্র একটি করে কাঠের লাঠি। দুর্গে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ছিল না, এমনকি তাদের কাছে কোনো টর্চলাইটও ছিল না।
বালকিষান বলেন, ডাকাতরা তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিলে নিজের জীবন বাঁচাতে তিনি একপাশে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
১৬ শতকের কামানটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
চুরি হওয়া কামানটি কেবল একটি পুরোনো ধাতব কাঠামো নয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এটি ভারতের সামরিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই কামানটি ১৬ শতকের। তৎকালীন সময়ের ধাতুশিল্প ও যুদ্ধপ্রযুক্তির এক অনন্য নিদর্শন ছিল এটি। কামানের গায়ে থাকা সূক্ষ্ম খোদাই করা নকশা ও ঐতিহাসিক চিহ্ন একে অত্যন্ত বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল।
তাছাড়া, ঐতিহাসিক সম্পদের মূল্য শুধু টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক কালোবাজারে এ ধরনের শতাব্দী প্রাচীন বিরল নিদর্শনের দাম কোটি কোটি টাকা হতে পারে।
পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে এর পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র জড়িত কি না। পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে চুরির মামলা করেছে। আশেপাশে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। সাইবার সেলও অবৈধ প্রত্নসম্পদ ব্যবসার নেটওয়ার্কের সন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে।
সূত্র: এনডিটিভি









