আজ জাতীয় নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনের দিন, তার আগে কয়েক দিন কালো টাকার ছড়াছড়ি হয়। অসৎ নেতারা সামান্য অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনার চেষ্টা করেন। অভাবী ও সহজ-সরল অনেক ভোটার না বুঝে কিছু টাকার বিনিময়ে অযোগ্য ও অসৎ প্রার্থীকে ভোট দিয়ে থাকেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনাবেচা করা হারাম। ফকিহরা ভোট কেনাবেচা হারাম হওয়ার তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। তা হলো—এটা ঘুষ, এটা মিথ্যা সাক্ষ্য এবং এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়। আর উল্লিখিত তিনটি জিনিসই শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম ও কবিরা গুনাহ।
যোগ্য ব্যক্তির হাতে আমানত পৌঁছে দেওয়ার একটি দিক হলো জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে একজন যোগ্য ও আমানতদার ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা। কেননা জনপ্রতিনিধি আমানতদার না হলে সে অসংখ্য আমানত নষ্ট করবে। ফকিহ আলেমরা বলেন, ‘যে জিনিসের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির অধিকার নষ্ট করা হয় অথবা কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় সেটাই ঘুষ।
উল্লিখিত সংজ্ঞার আলোকে নির্বাচনের সময় ভোটারকে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে ভোটপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাও এক প্রকারের ঘুষ। কেননা এটা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করে এবং যোগ্য ব্যক্তিকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। পাশাপাশি তা অযোগ্য ব্যক্তির বিজয়কে ত্বরান্বিত করে। আর ঘুষ কোরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলের আলোকে হারাম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা মিথ্যা শ্রবণে অত্যন্ত আগ্রহী এবং অবৈধ ভক্ষণে অত্যন্ত আসক্ত।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৪২)
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি (রহ.) বলেছেন, আয়াতে অবৈধ ভক্ষণ দ্বারা ঘুষ উদ্দেশ্য।
(মাফাতিহুল গায়েব : ১১/৩৬১)
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের প্রতি অভিশাপ করেছেন।’
(সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৫৮০)
হাদিসটি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সাওবান (রা.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। সেই বর্ণনায় ‘রা-ইস’ শব্দ অতিরিক্ত আছে। ‘রা-ইস’ বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহীতার মধ্যে মধ্যস্থ হিসেবে কাজ করে। (ফাইজুল কাদির : ৫/২৬৮)
এই বর্ণনা অনুসারে যারা ভোট কেনার জন্য এজেন্ট হিসেবে কাজ করে, তারাও হারামে লিপ্ত। এবং তার প্রতিও মহানবী (সা.)-এর অভিশপ রয়েছে। ইমাম জাহাবি (রহ.) ও আল্লামা ইবনে হাজার হাইসামি (রহ.) ঘুষকে কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন।
(কিতাবুল কাবায়ির, পৃষ্ঠা-১৩১) কোনো স্বার্থ হাসিলের জন্য জেনে-বুঝে অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানের শামিল এবং তা কবিরা গুনাহ। প্রকৃত পক্ষে শরিয়তের দৃষ্টিতে মিথ্যা সাক্ষ্য হলো, না জেনে কোনো বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়া অথবা বাস্তবতার পরিপন্থী সাক্ষ্য দেওয়া।
(আল ফাওয়াকিহুদ দিওয়ানি : ২/২৭৮)
স্বার্থ হাসিলের জন্য ভোট দেওয়াকে মিথ্যা সাক্ষ্য বলার কারণ হলো, ভোট মূলত এক প্রকার সাক্ষ্য। কোনো প্রার্থীকে ভোট দানের মাধ্যমে ব্যক্তি মূলত এই সাক্ষ্য প্রদান করে যে এই প্রার্থী যোগ্যতা, আমানতদারিতা ও সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্য। কিন্তু যখন ব্যক্তি যোগ্যতা ও দ্বিনদারি বিবেচনা না করে ভোট দেয়, তখন বাস্তবতা ভূলণ্ঠিত হয়, সাক্ষ্যের উদ্দেশ্য নষ্ট হয় এবং মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়। শরিয়তে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া নিষিদ্ধ ও মারাত্মক গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা বর্জন করো মূর্তি পূজার অপবিত্রতা এবং দূর থাকো মিথ্যা কথা থেকে।’
(সুরা : হজ, আয়াত : ৩০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা সাবধান হও মিথ্যা কথার ব্যাপারে এবং তোমরা সাবধান হও মিথ্যা সাক্ষ্যের ব্যাপারে (অর্থাৎ তোমরা পরিহার করো)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৭৬)ভোট ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার তৃতীয় কারণ হলো এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অধিকার নষ্ট করা হয় এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়। আর অন্যের অধিকার নষ্ট করা হারাম। যখন অর্থের বিনিময়ে ভোট দেওয়া হয়, তখন অযোগ্য ব্যক্তি নির্বাচিত হয়। অথচ এই ব্যক্তি মানুষের প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্য নয়। প্রতিনিধি হওয়ার পর এই ব্যক্তি মানুষের হক নষ্ট করে, তার ওপর অর্পিত আমানত নষ্ট করে। তার অযোগ্যতার কারণে সমাজ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ফলে মানুষ বহুবিধ কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। মানুষকে এভাবে ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায় থেকে কাউকে কাজের জন্য নির্বাচন করল, অথচ সেই সম্প্রদায়ের ভেতর আল্লাহর অধিক প্রিয়ভাজন কেউ ছিল; সে আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনদের সঙ্গে খিয়ানত করল।’
(মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস : ৭০২৩)এই হাদিস থেকে প্রমাণ হয়, কোনো পদ ও দায়িত্বের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনীত করা ওয়াজিব। আর অযোগ্য ব্যক্তিকে মনোনীত করা আমানতের খিয়ানত, যা আল্লাহ তাকে অর্পণ করেছিলেন। অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া শরিয়তের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। কেননা শরিয়তের উদ্দেশ্য হলো সামগ্রিক কল্যাণ। উবাদা বিন সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সিদ্ধান্ত দিয়েছেন—ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না এবং অন্যকে ক্ষতি করা যাবে না।’
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৩৪০)মোল্লা আলী কারি (রহ.) উল্লিখিত হাদিসের ব্যাখ্যায় লেখেন, ক্ষতি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শারীরিক ক্ষতি, আর্থিক ক্ষতি, জাগতিক ক্ষতি ও পরকালীন ক্ষতি—সবকিছু অন্তর্ভুক্ত। (মিরকাতুল মাফাতিহ)
আল্লাহ সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।










