সরকারি দুই হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধের শঙ্কা

যোগাযোগ ডেস্ক:

সরকারি দুটি হাসপাতালে দরিদ্র কিডনি রোগীদের জন্য বিনামূল্যের ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিকল্প হিসেবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেবা চালুর সিদ্ধান্ত হলেও প্রয়োজনীয় ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনা নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা।

এরই মধ্যে দুটি দরপত্র বাতিল হয়েছে। তৃতীয় দরপত্রে অস্বাভাবিক শর্ত যুক্ত করায় নিম্নমানের যন্ত্র সরবরাহের শঙ্কা রয়েছে। এ নিয়ে আপত্তি তুলেছে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এই কেনাকাটার প্রক্রিয়া শেষ করতে আরও পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে। এ সময়ে রোগীরা কোথায় সেবা পাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন স্বল্প আয়ের রোগীরা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় ২০১৭ সালের ৪ মার্চ থেকে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্যান্ডরের মাধ্যমে ঢাকার জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) ১০১টি ডায়ালাইসিস যন্ত্রের মাধ্যমে রোগীদের সেবা দেওয়া শুরু হয়। আগামী ২৯ নভেম্বর ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদি চুক্তি শেষ হচ্ছে।

স্যান্ডরের সহকারী ব্যবস্থাপক তায়েফ রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত সরকার থেকে চুক্তি নবায়ন বা এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, অন্তর্বর্তী সময়ে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়ার আলোচনা রয়েছে।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন সমকালকে বলেন, নতুন ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনাসহ যাবতীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে নতুন মেশিন স্থাপনসহ যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করতে পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর এক হাজার ৩০টি ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে। এতে বাজেট ধরা হয় ২৬৭ কোটি টাকা। দরপত্রে ৭০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসনের (এফডিএ) অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে কোনো কারণ ছাড়াই ওই দরপত্র বাতিল করা হয়।

২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর আহ্বান করা হয় দ্বিতীয় দফা দরপত্র। এতে কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত ৭০ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা করা হয়। অপরিবর্তিত রাখা হয় বাকি শর্ত। এই দরপত্রে চারটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। তবে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই শর্ত পূরণ করতে না পারায় দ্বিতীয় দফাতেও দরপত্র বাতিল হয়ে যায়।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তৃতীয়বার ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনার এপিপি (বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা) অনুমোদন করা হয়। নতুন করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় অধ্যাপক ড. আ ন ম এহসানুল করীমকে।

সর্বশেষ দরপত্রে আবারও শর্তে বদল আনা হয়। এবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১৬০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অন্তত এক হাজার ডায়ালাইসিস যন্ত্র স্থাপন ও সরবরাহের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মনিটরের আকার ১৫ ইঞ্চি থেকে কমিয়ে ১০ ইঞ্চি করা হয়েছে। এ ছাড়া যন্ত্রের সঙ্গে ব্যবহারের জন্য ডায়ালাইজার আগে একটি চাওয়া হলেও তৃতীয় দরপত্রে তা বাড়িয়ে দুটি করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে সরকারের খরচও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ক্রয়বিষয়ক নীতিমালায় পরিবর্তন এনেছে। নতুন নিয়মে কাজ পেতে আগের কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক নয়। আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

অস্বাভাবিক শর্ত যুক্ত করায় আপত্তি তুলেছে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাদের দাবি, সব শর্ত পূরণ করে দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দরপত্রে অংশ নেওয়া কঠিন। জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে  যুক্ত একটি কোম্পানি এ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।

তৃতীয় দরপত্রে হঠাৎ এত শর্ত পরিবর্তন বা যুক্ত করার কারণ জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. আ ন ম এহসানুল করীম বলেন, আমি এখন রোগী দেখছি। প্লিজ, পরে ফোন দিয়েন। পরে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি আর সাড়া দেননি।

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, যন্ত্র কেনাকাটায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দক্ষতার অভাব নেই। এর জন্য দায়ী রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়। এতে যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে। ভোগান্তি পোহাতে হয় রোগীদের।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সমকালকে বলেন, নতুন করে সরকার ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্যান্ডরের সঙ্গে করা অসম চুক্তি আর নবায়ন করবে না। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কিডনি ডায়ালাইসিস সেবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যন্ত্র কেনার প্রক্রিয়াতে গতি ফেরাতে কাজ চলছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি। -সমকাল

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ