ডিসেম্বর, তুমি এসেছ এবার পায়ে পায়ে, যেন এক বিধবা মা এসেছে গোরস্থানে কিংবা শ্মশানে-চোখে তার জল নেই, শুধু শূন্য দৃষ্টি, হাতে একটা লাল-সবুজ শাড়ির ছেঁড়া আঁচল। তুমি দাঁড়িয়ে আছ রাস্তার মোড়ে, কেউ ডাকছে না ‘মা’ বলে। একদিন তুমি ছিলে অগ্নিগর্ভা। তোমার বুকের ভিতর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল ৯ মাসের রক্তনদী, তোমার গর্ভে জন্ম নিয়েছিল ৩০ লাখ শহীদ। তাদের কান্না ছিল তোমার গান, তাদের শেষ নিশ্বাস ছিল তোমার জয়ধ্বনি। আমরা ছোটরা ছুটতাম তোমার পিছু পিছু, হাতে ছিল লাল-সবুজের কাগজের পতাকা, কণ্ঠে ছিল বিজয়ের গান। তুমি হাসতে, আমরা বুক ফুলিয়ে গাইতাম ‘মা ভাবনা কেন… আমরা হারব না, হারব না তোমার মাটির একটি কণাও ছাড়ব না।’ ডিসেম্বর এলেই আমাদের বুকের ভিতর একটা অদ্ভুত কাঁপন জাগত। পাড়া-মহল্লায় সাজ সাজ রব উঠত। রেডিওতে বাজত ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল’, টিভিতে চলত ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’। সেই ডিসেম্বর এখন কোথায়? ডিসেম্বর মানে বাংলাদেশের জন্য শুধু শীতের শুরু নয়, এ মাস মানে রক্তে রাঙানো বিজয়, মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত জয়, লাল-সবুজের পতাকা, বিশ্ব মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মাস। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এসে দেখা যাচ্ছে, দেশের মূলধারার গণমাধ্যম-টেলিভিশন, পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল; বিজয় দিবসকে নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বাস দেখাচ্ছে না। পত্রিকাগুলোতে চলছে দায়সারা কাজ। টিভি চ্যানেলে নেই আগের মতো উদ্যাপন। যেখানে একসময় পুরো মাসজুড়ে চলত ‘বিজয়ের মাস’ স্পেশাল, মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার, ১৯৭১-এর গানের বিশেষ অনুষ্ঠান, বিজয়ের রক্তস্রোত ইতিহাস, বীরশ্রেষ্ঠদের বীরত্ব, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বীভৎসতা, রাজাকারদের রাজলীলা, বিশেষ নাটক, টক শো, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। এই দৈন্যের পেছনে কি শুধুই মিডিয়ার অলসতা, না কি গভীর রাজনৈতিক কারণ আছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও তার ফলে সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে। আমাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় দিবসকে অতীতে আওয়ামী বয়ানে আওয়ামী লীগ একচেটিয়াভাবে দখল করে রেখেছিল। আওয়ামী বুদ্ধিজীবী, আওয়ামী মিডিয়া বিষয়টিকে এমনভাবে ব্র্যান্ডিং করেছিল যে মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগের একক মালিকানাধীন। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসনকালে বিজয় দিবস মানেই ছিল শেখ হাসিনার ভাষণ, শেখ মুজিবের ভাষণ, শেখ মুজিবের প্রতিকৃতিতে ফুল দেওয়া, আর সরকারি-বেসরকারি সব মিডিয়ায় ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত’ আওয়ামী বন্দনার বন্যা। বিজয় দিবসকে তারা একটা রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত করেছিল।
স্বাধীনতাযুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিয়ে শুধু চেতনাকে পুঁজি করে যে দলটি নিজেকে ‘মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র উত্তরাধিকারী’ বলে দাবি করত, সেই দলটির প্রধান এখন পলাতক, অনেকে বিদেশে কিংবা কারাগারে। অন্যদিকে স্বাধীনতার ঘোষকের দল বিএনপি। সেক্টর কমান্ডের দল বিএনপি। এই দল মুক্তিযুদ্ধের পদকধারী বীরদের সমন্বয়ে গঠিত। সেই বিএনপি মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে সর্বজনীন করতে চেয়েছে। এর ফলে এবার ‘বিজয়ের মাস’ পালন করার রাজনৈতিক মালিকানা এখন শূন্যে ঝুলছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার, যার নেতৃত্বে আছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তারা স্পষ্টতই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র পুরোনো আওয়ামী বয়ানে ফিরে যেতে চায় না। কারণ সেই বয়ানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একদলীয় শাসন, দমনপীড়ন, গুম-খুন আয়নাঘর আর দুর্নীতির কলঙ্ক। তাই তারা বিজয় দিবস পালন করছে অত্যন্ত সন্তর্পণে-শুধু রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্য। কিন্তু তারা বা বিএনপি নতুন কোনো বয়ানও তৈরি করতে পারেনি। ফলে বিজয় দিবস এখন ‘এতিম’ হয়ে পড়ে আছে।
মিডিয়ার ভূমিকা আরও জটিল। অনেক মালিক ও সম্পাদকের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গভীর ব্যবসায়িক-রাজনৈতিক সম্পর্ক। ২০২৪-এর আগস্টের পর অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন, অনেকে পালিয়ে গেছেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এই পরিস্থিতিতে তারা যদি পুরোদস্তুর ‘বিজয়ের মাস’ পালন শুরু করে, তাহলে জনমনে প্রশ্ন উঠবে-এটা কি আওয়ামী লীগের প্রতি আনুগত্য দেখানোর চেষ্টা? অনেক মিডিয়া তাই নিরাপদ পথ বেছে নিয়েছে-নীরবতা। আবার যেসব মিডিয়া আওয়ামী নিয়ন্ত্রিত নয় বলে পরিচিত, তারাও বিজয় দিবস নিয়ে বড় করে কিছু করছে না শুধু দূরদৃষ্টির অভাবে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখবেন, July-August Revolution নিয়ে পোস্টের বন্যা, কিন্তু বিজয় দিবস নিয়ে তেমন কিছু নেই। অথচ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফ্যাসিবাদের পতনের পরেই বলেছেন, ’৭১ ছিল আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম আর ২৪ স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম। তাঁর এই বয়ানকেও এই বিজয়ের মাসে বিএনপি বা জাতীয়তাবাদী শক্তি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। এই শূন্যতার আরেকটা ফলাফল হলো, স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী এখন চেষ্টা করছে বিজয় মাসকে সাদামাঠা অন্য একাটি মাসের মতো প্রচার করতে। তাদের হয়ে কাজ করছে পঞ্চম স্টেট। অতীতে জাতীয় ঐক্য গঠনে গণমাধ্যম বা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। গণমানুষের মাঝে স্বদেশপ্রেম ও ঐক্যের মালা গেঁথেছে। গৌরবের আত্মপরিচয়ে যেন কোনো শূন্যতা তৈরি না হয়।
২০২৫-এর ডিসেম্বরে বিজয়ের মাসের এই দৈন্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটা একটা রাজনৈতিক শূন্যতার প্রতিফলন। বিজয়ের মাস আমাদের সবার, এটা কোনো একটা দলের নয়। এই মাস আমাদের এক হয়ে দেশপ্রেম জাগ্রত করার মাস, এই মাস আমাদের মাথা উঁচু করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সব অপশক্তির পতন ঘটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শপথের মাস। যত দিন না উৎসবে উৎসবে মুখর হবে ডিসেম্বর, তত দিন বিজয়ের মাস থাকবে আনুষ্ঠানিকতার গন্ডিতে বন্দি। আর আমরা, সাধারণ মানুষ, হারাব আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় গৌরবের উৎসবের আবেগ। এই শূন্যতা পূরণ করতে না পারলে একসময় হয়তো দেখব, ১৬ ডিসেম্বর শুধু ক্যালেন্ডারের একটা তারিখ হয়ে যাবে-কোনো অনুভূতি জাগাবে না।
♦ লেখক : কলামিস্ট
/ বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে নেয়া










