এক লাখ টন জ্বালানি তেল দেশে আসছে আফ্রিকা ঘুরে

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলার কারণে হরমুজ প্রণালিসহ আশপাশের নৌপথে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ এড়িয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জন্য এক লাখ টনের বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে আফ্রিকা ঘুরে বাংলাদেশে আসছে মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজ এমটি নিনেমিয়া।

আগামী শনিবার জাহাজটির চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর আগে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরুর পর একই জাহাজে করে বাংলাদেশে প্রথম ক্রুড অয়েলের চালান এসেছিল। ওই চালানের তেল দিয়ে ক্রুড অয়েলের মজুদ ফুরিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন ইউনিট পুনরায় চালু করা হয়।
বিপিসির শতভাগ ক্রুড অয়েল পরিবহন করে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থেই বিএসসি ও জাহাজটির মালিকপক্ষ বা স্থানীয় এজেন্টের দীর্ঘ আলোচনার পর তারা এই বিকল্প দীর্ঘ পথে রাজি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে জাহাজটি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি হয়ে চার হাজার ২০০ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ১৩ থেকে ১৫ দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আসত। কিন্তু নতুন রুটে সুয়েজ খাল, জিব্রাল্টার প্রণালি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ (কেপ অব গুড হোপ) ঘুরে আসায় পথ প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল বেড়েছে এবং সময় লাগছে প্রায় ৫২ দিন। ঘুরপথে চলাচল করায় জাহাজের নিজস্ব জ্বালানি, সুয়েজ খাল পার হওয়ার ফি ও ভাড়াসহ কয়েক মিলিয়ন ডলার বাড়তি খরচ যুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু খরচ নির্দিষ্ট থাকলেও পূর্ণাঙ্গ আর্থিক হিসাব উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে।
বিএসসি, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি সূত্রে জানা যায়, ২৪৯.৯৫ মিটার লম্বা, ৪৪.৪ মিটার প্রশস্ত ও ১৪.৬ মিটার ড্রাফটের এমটি নিনেমিয়া গত ২৩ জুলাই ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ চার হাজার ২৬ টন ক্রুড অয়েল লোড করে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে ১১ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলা এই জাহাজটি বাংলাদেশের জলসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। বরাবরের মতো জাহাজটি বহির্নোঙরে পৌঁছানোর পর ছোট ছোট ট্যাংকারে ক্রুড অয়েল লাইটারিংয়ের (খালাস) সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে বিপিসির অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার ৪০০ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হচ্ছে, যার বিপরীতে বিপিসি থেকে পরিশোধন ফি পায় ইআরএল। উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে ডিজেলের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি।
এ ছাড়া উপজাত (বাই প্রোডাক্ট) হিসেবে এলপিজি, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন ও অকটেন উৎপাদিত হয়। ইআরএলের ট্যাংকে বর্তমানে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার টন ক্রুড অয়েল মজুদ রয়েছে। এর বাইরে এসপিএমের (সিঙ্গল পয়েন্ট মুরিং) পাইপলাইনে কিছু ক্রুড অয়েল রাখা ছিল, যা হরমুজ প্রণালির সংকটের সময় প্লান্ট চালু রাখতে ব্যবহার করা হয়েছিল।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজের বার্থিং, লাইটারিং, চলাচল ও খালাস কার্যক্রমে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে গত ১২ এপ্রিল রাতে ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এমটি নিনেমিয়ার প্রথম চালানে তেল আসার পর গত ৮ মে শোধনাগারটি পুনরায় চালু হয়। এ সময় সংকট মোকাবেলায় সরকার মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত ডিজেল আমদানি করে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted