মঙ্গলবার | ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ | ১৫ বৈশাখ, ১৪৩৩ | ১০ জিলকদ, ১৪৪৭

নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান, ফোনের অপেক্ষায় ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে চলমান শান্তি আলোচনা অচলাবস্থায় পড়েছে। কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ পাল্টাপাল্টি প্রয়োগের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, সাম্প্রতিক তেহরান-ওয়াশিংটন আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও অতিরিক্ত দাবির কারণে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা এগোলেও শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান চাইলে আলোচনা পুনরায় শুরু করতে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে। ফক্স নিউজের ‘দ্য সানডে ব্রিফিং’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) যদি কথা বলতে চায়, তবে তারা আমাদের কাছে আসতে পারে অথবা আমাদের ফোন করতে পারে। আপনারা জানেন, সেখানে টেলিফোন আছে। আমাদের কাছে চমৎকার ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন ইরান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র এতে বিজয়ী হবে।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে আরাগচি বর্তমানে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অবস্থান করছেন। সেখানে তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে চলমান যুদ্ধবিরতি, আলোচনার সর্বশেষ অবস্থা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। বৈঠকে পুতিন বলেছেন, ইরানসহ ওই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর স্বার্থে রাশিয়া সম্ভাব্য সবকিছু করবে।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ইরানের জনগণ বর্তমানের এই ‘কঠিন সময়’ কাটিয়ে উঠবে এবং সেখানে শান্তি ফিরে আসবে।

ইরান তাদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখার একটি তালিকা পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে। এতে পরমাণু ইস্যুর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং যুদ্ধের অবসান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নতুন প্রস্তাবও দিয়েছে তেহরান, যেখানে পরমাণু আলোচনা পরবর্তী পর্যায়ের জন্য স্থগিত রাখার কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়া বলছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ব্ল্যাকমেল’ ও ‘আলটিমেটাম’ কৌশল পরিহার করতে হবে। ভিয়েনায় নিযুক্ত রুশ দূত মিখাইল আলইয়ানভ সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ, কঠোর নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখিয়ে আলোচনা চালাতে চায়। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যেতে অভ্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরানে তা কাজ করবে না। তিনি আরও লেখেন, এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো এসব বাদ দেওয়া। তিনি হ্যাশট্যাগ দিয়ে তিনটি কৌশল বাদ দেওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেন। এগুলো হলোÑ ‘ব্ল্যাকমেলিং’, ‘আলটিমেটাম’ ও ‘ডেডলাইন’।

পরিস্থিতির সামরিক দিকেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরে নৌ-অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে ৩৮টি জাহাজকে গতিপথ পরিবর্তন বা ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। অপরদিকে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি জাহাজ ‘পরিদর্শনের’ জন্য আটক করেছে এবং এই পথ পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করেছে।

হরমুজ প্রণালির চলাচল সীমিত থাকায় সেখানে শতাধিক তেলবাহী ট্যাংকার আটকে পড়েছে। একটি বাণিজ্য সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার ৪০০ নাবিক এসব জাহাজে অবস্থান করছেন এবং কবে তারা ফিরে যেতে পারবেন, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। আলোচনা থমকে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটÑ উভয় সূচকেই দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ চলমান পরিস্থিতিকে ‘কার্ডের খেলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, তেহরানের হাতে এখনও গুরুত্বপূর্ণ কিছু কৌশলগত বিকল্প রয়েছে, যেমন হরমুজ প্রণালি, বাব এল-মান্দেব প্রণালি এবং জ্বালানি পাইপলাইন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তার বেশকিছু অর্থনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড় এবং চাহিদা নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ রয়েছে।

ইউরোপেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছেন। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ও সরকারের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা কমিটির প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেবেন। স্টারমার বলেছেন, এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তার একটি বড় উদাহরণ।

সামরিক দিক থেকে, ইরান জানিয়েছে যে তারা বিভিন্ন অবিস্ফোরিত বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করেছে, যা সাম্প্রতিক সংঘাতের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এ সংক্রান্ত অভিযান পরিচালনা করছে।

কূটনৈতিক আলোচনা চালু রাখার প্রচেষ্টা থাকলেও মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক প্রস্তুতি সমান্তরালে চলতে থাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ