রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদে

সড়ক-অ্যাম্বুলেন্স নেই, স্বজনের কাঁধই ভরসা

অনলাইন ডেস্ক :

রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদে এখনো পৌঁছায়নি আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা। উঁচু-নিচু আঁকাবাঁকা পথে নেই সড়ক, নেই অ্যাম্বুলেন্স; ফলে জরুরি মুহূর্তে অসুস্থ মানুষকে কাঁধে তুলে পাড়ি দিতে হয় দুর্গম পথ। সন্তানসম্ভবা নারী থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগী-সবাইকে চিকিৎসার জন্য নির্ভর করতে হয় স্বজনদের কাঁধের ওপর। প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে এমনই অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন লংগদুর দুর্গম পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রসববেদনায় ছটফট করতে শুরু হয় ওই উপজেলার বাসিন্দা সুমিতা চাকমার। এসময় হাসপাতালে নেওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না স্বামী সুপন চাকমা। কারণ দুর্গম পথ ও পাহাড়ি ঢল পেরিয়ে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হলে পাড়ি দিতে হবে অন্তত ৫ কিলোমিটার খাড়া পাহাড়ি পথ, পাঁচটি প্রমত্ত ঝিরি ও তিনটি উঁচু পাহাড়। সেখানে নেই কোনো যানবাহন, সড়ক কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্ক। পরে বাধ্য হয়ে পাড়ার চার ব্যক্তি বাঁশ ও বোরগি (কোমড় তাঁতে বোনা চাকমাদের বিশেষ কাঁথা বা চাদর) দিয়ে তৈরি করেন ‘ভাড়’ বা ঝুলন্ত দোলা। বৃষ্টি কিছুটা কমলে সেই দোলায় সুমিতাকে শুইয়ে শুরু হয় দুর্গম পাহাড়ি পথের যাত্রা।
প্রায় ৩ ঘণ্টার চেষ্টায় তাকে নেওয়া হয় লংগদু-দিঘীনালা সড়কের পাশে ডাঙ্গাবাজার নামক এলাকায়। পরে এখান থেকে অটোরিকশায় করে সুমিতাকে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ৫ আগস্ট রাতে সুমিতা চিকিৎকদের সহযোগিতায় সন্তান প্রসব করেন তিনি।
সুপন চাকমা বলেন, আমি ও আমার পরিবার খুবই ভয়ের মধ্যে একটা দিন পার করেছি। প্রতিবেশীরা আমাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে। তারা এগিয়ে না এলে আমার স্ত্রী ও সন্তানকে বাঁচানো সম্ভব হতো না। তবে এখনো বাড়ি ফিরে যেতে আবারও প্রতিবেশি সেই বন্ধুদের সহযোগিতা নিতে হবে। এছাড়া স্ত্রী ও সন্তানকে এই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বাড়িতে নেওয়া সম্ভব হবে না।
এদিকে এমন ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির শত শত দুর্গম পাড়ায় এভাবেই চিকিৎসাসেবা বঞ্চনার শিকার অসংখ্য মানুষ। চিকিৎসার অভাবে অকালে ঝরে পড়ছে অসংখ্য প্রাণ। সমতলে যখন ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও আধুনিক চিকিৎসার আলো পৌঁছে গেছে, তখন পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আটকে থাকা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে একটি সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ বা স্যালাইন পাওয়াও যেন পরম সৌভাগ্যের বিষয়।
দুর্গম শীলাছড়ার পেরা আদম পাড়ার বাসিন্দা মানবেন্দ্র চাকমা  বলেন, আমাদের গ্রামসহ আশেপাশের আরও ৫টি গ্রামে কোনো রাস্তা নেই। এখানের বাসিন্দারা খুবই কষ্টে বসবাস করে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এখানকার ঝিরিগুলোতে স্রোত থাকে। তখন পারাপার হওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। বয়স্ক মানুষ, শিশু, রোগী ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এই দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া খুবই বিপজ্জনক।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted