চীনাদের ভুয়া বিয়ের ফাঁদে গরিব-প্রান্তিক নারীরা

যোগাযোগ ডেস্ক :

প্রান্তিক ও গরিব মেয়েদের টার্গেট করছে চীনা নাগরিকদের একাংশ। ভালোবাসার সম্পর্কের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। দেখানো হচ্ছে স্বপ্নের সংসারের আশাও। এরপর ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে চীনে পাচারের ফাঁদ। এমন অভিযোগের মধ্যেই সামনে এসেছে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। ২০২০ থেকে ২০২৫—ছয় বছরে কিউ-১ ভিসায় চীনে গেছেন ৪ হাজার ২২৬ বাংলাদেশি নারী। শুধু গত বছরই গেছেন ১ হাজার ৭২১ জন।

তবে বিয়ের আড়ালে কতজন নারী পাচারের শিকার হয়েছেন, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। কতজন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন, সেই তথ্যও রাষ্ট্রের কাছে নেই। এ বিষয়ে গত শনিবার ঢাকায় এক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ব্রিটিশ হাইকমিশনের সহায়তায় কর্মশালাটির আয়োজন করে মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশ।
কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে কিউ-১ ভিসায় ৬৯ বাংলাদেশি নারী চীনে যান। ২০২১ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭ জনে। ২০২২ সালে ৩৫ জন নারী একই ভিসায় চীনে যান। এরপর ২০২৩ সালে সংখ্যাটি হঠাৎ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬ জনে। ২০২৪ সালে কিউ-১ ভিসায় চীনে যাওয়া নারীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৭৮। পরের বছর ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭২১ জনে। সম্প্রতি ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশি নারীদের চীনে পাচারের অভিযোগ সামনে আসার পর এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করতে প্রস্তাবিত কর্মপদ্ধতির ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় রয়েছে। প্রস্তাবিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী, বিয়ে নিবন্ধনের পর বিয়ে সনদ প্রথমে নোটারি পাবলিক এবং পরে আইন মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত করতে হবে।

কর্মশালায় ইমিগ্রেশনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবু নোমান বলেন, ‘অপরাধী চক্র ভিসা পাওয়ার জন্য ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বিদ্যমান প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করছে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে।’

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, চলতি বছর পাস হওয়া মানবপাচার আইনে আন্তর্জাতিক প্রটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় পাচারের বিষয়টিকে পৃথক অধ্যায় হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানসংক্রান্ত অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও তদন্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে।

মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম (অভিবাসন কর্মসূচি) এবং ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরীফুল হাসান কালবেলাকে বলেন, বিদেশি নাগরিকদের বিয়ে করার আগে খোঁজ খবর নিতে হবে। তিনি আসলে সেই দেশের নাগরিক কি-না, বিয়ের আড়ালে অন্য কাজে নিয়ে যাচ্ছে কি-না। এবং যেসব মেয়েদের বিয়ে করে নিয়ে গিয়েছে তাদের মধ্যে কতজন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, দেশে কতজন ফেরত আসছে। কি কারণে ফেরত আসলেন এসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখা দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

তিনি বলেন, চীনা নাগরিকরা অসহায় গরীব মেয়েদের টার্গেট করছে। তাদের বিয়ে করে নিয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে বিয়ে করছে না, নাকি অন্যকোনো অনৈতিক কাজে নিয়োজিত করছে এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব আছে। সরকারের উচিত সেসব দেশের দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে সততা যাচাই-বাছাই করে নিয়মের মধ্যে রাখা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ কালবেলাকে বলেন, এ ধরনের নারী পাচার আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের মধ্যে পড়ে। বিয়ের কথা বলে তাদের দেশে নিয়ে গিয়ে অন্য বা অনৈতিক কাজের নিযুক্ত করা হলে বা নির্যাতন করা হলে এটা অপরাধ। এই বিষয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিষয় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশের মানুষকে সতর্ক করছে। চীনা নাগরিক বিয়ে এবং কিউ-১ ভিসার দিয়ে বাঙালি মেয়ের সেই দেশে নিয়ে যাওয়া সম্পর্কে মন্ত্রণালয় দূতাবাসকে অবহিত করেছে। কিন্তু তারা একবার বলে আপত্তি আবার আরেক বলে অনাপত্তি। সুত্র : কালবেলা

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted