চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ‘গলাকাটা মোবারক’ নামে পরিচিত মোবারক হোসেন ওরফে কালা মোবারককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ডে কিলিং স্কোয়াডের শুটার হিসেবে তাকে ব্যবহার করা হয়েছে। মোবাইল ফোনে টার্গেট ব্যক্তির ছবি দেখিয়ে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হতো। এরপর দুই হাতে দুটি পিস্তল নিয়ে হামলায় অংশ নিতেন মোবারক।
বুধবার (২৬ আগস্ট) ভোরে ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর পল্লানপাড়া এলাকায় এক সহযোগীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার সঙ্গে আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, ম্যাগাজিন ও গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম এসব তথ্য জানিয়েছেন। পুলিশ সুপার বলেন, মোবারক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ বড় সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন ও রায়হানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তাদের কিলিং স্কোয়াডের অন্যতম শুটার হিসেবে মোবারক কাজ করতেন। দুই হাতে একসঙ্গে গুলি চালাতেও তিনি পারদর্শী। কে টার্গেট হবে, কোথায় যেতে হবে কিংবা কাকে হত্যা করতে হবে, এসব সিদ্ধান্ত মোবারক নিজে নিতেন না। ওপরের নির্দেশ অনুযায়ীই তিনি হামলা বা হত্যাকাণ্ডে অংশ নিতেন।
পুলিশ জানায়, সম্প্রতি তাদের কাছে তথ্য আসে, লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর কল্যাণপাড়ায় এক সহযোগীর বাড়িতে রাতে অবস্থান করছেন মোবারক। ওই তথ্যের ভিত্তিতে হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আজিজ ও ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অভিযান চালায়।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে বাড়ির ভেতর থেকে গুলি ছোড়া হয়। পরে পুলিশ বাড়িটি ঘিরে ফেললে পালানোর সুযোগ নেই বুঝতে পেরে মোবারক আত্মসমর্পণের কথা বলেন। একই সঙ্গে তাকে যেন গুলি করা না হয়, সেই অনুরোধও করেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।
অভিযানে একটি ৯ মিলিমিটার বিদেশি পিস্তল, একটি ৭ দশমিক ৬৫ মিলিমিটার বিদেশি পিস্তল, একটি বিদেশি রিভলবার ও একটি দেশীয় তৈরি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৯ মিলিমিটার পিস্তলটি ব্রাজিলের তৈরি এবং ৭ দশমিক ৬৫ মিলিমিটার পিস্তলটি ইতালির তৈরি। এ ছাড়া ৯ মিলিমিটার পিস্তলের ১৮ রাউন্ড গুলি, ৭ দশমিক ৬৫ মিলিমিটার পিস্তলের পাঁচ রাউন্ড গুলি, তিনটি ম্যাগাজিন, তিনটি পিস্তলের গুলির খোসা এবং চারটি শটগানের গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সুপারের দাবি, উদ্ধার হওয়া ৯ মিলিমিটার পিস্তলটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্রগুলোর একটি।
গ্রেপ্তারের পর বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) অস্ত্র ও পুলিশের ওপর হামলার পৃথক দুই মামলায় মোবারকসহ চারজনের প্রত্যেককে চার দিন করে মোট আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন চট্টগ্রামের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
রিমান্ডে যাওয়া অন্য তিন আসামি হলেন- মোহাম্মদ রায়হান (৪০), মো. ফরিদ (৫০) ও মো. নাছির (৫২)। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম জেলা আদালতের কোর্ট পরিদর্শক হাবিবুর রহমান।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৩ জুন চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মোবারকের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজে পাঁচজনকে দেখা যায়। তাদের মধ্যে মোবারকও ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ফুটেজে তার দুই হাতে দুটি পিস্তল দেখা যায়।
পুলিশ সুপার বলেন, মোবারক ব্যক্তিগতভাবে মাকসুদকে চিনতেন না। হত্যার আগে রায়হান মোবাইল ফোনে মাকসুদের ছবি পাঠিয়ে তাকে টার্গেট হিসেবে দেখিয়ে দেন। এরপর তাকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পুলিশের দাবি, মাকসুদকে লক্ষ্য করে প্রথম গুলিটি মোবারকই করেন। পরে মাথায় গুলি করার ঘটনাতেও তার সম্পৃক্ততা ছিল।
মাসুদ আলম বলেন, মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলায় সিসিটিভি ফুটেজে থাকা পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন দিদার, আফসার, ধামা ইলিয়াস ও কালা মোবারক। অপর একজন এখনো গ্রেপ্তার হননি।
জেলা পুলিশের দাবি, মাকসুদ হত্যা ছাড়াও ফটিকছড়ির জামাল ও সাদ্দাম হত্যা, রাউজানের মাসুদ হত্যা এবং নগরের সারোয়ার বাবলা হত্যা মামলায় মোবারকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
সারোয়ার বাবলা হত্যাকাণ্ডে মোবারক সরাসরি গুলি চালিয়েছিলেন বলেও দাবি করেছেন পুলিশ সুপার। নগরের সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের বাসার সামনে গুলির ঘটনাতেও মোবারকের উপস্থিতি ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।










