মঙ্গলবার | ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ | ১৫ বৈশাখ, ১৪৩৩ | ১০ জিলকদ, ১৪৪৭

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : স্বপ্ন হলো সত্যি

অনলাইন ডেস্ক :

পাবনার রূপপুর—একসময়ে ছিল এক নিভৃত গ্রাম। সেখানেই আজ দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু। রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়ামের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশের মর্যাদায় আসীন হলো বাংলাদেশ।
দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের পরিকল্পনা, প্রতিবন্ধকতা আর নানা বাধা পেরিয়ে বাস্তব রূপ পেয়েছে স্বপ্নের এই মেগাপ্রকল্প। এটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক অনন্য প্রতীক।
রূপপুর প্রকল্পের ইতিহাসের শুরু ১৯৬০-এর দশকে। ১৯৬১ সালে তখনকার পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়।
সম্ভাব্য স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয় রূপপুরকে। তবে ১৯৬৯ সালে সেই পরিকল্পনা বাতিল করে আইয়ুব খান সরকার।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের সময়ে প্রকল্পটি আবার আলোচনায় আসে। এ ব্যাপারে সহায়তার জন্য তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগও হয়।
তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
পরের কয়েক দশকে বিভিন্ন সরকার প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করলেও অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি।
২০০০-এর দশকে দেশে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করলে পারমাণবিক শক্তির বিষয়টি আবার গুরুত্ব পায়। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে অগ্রাধিকার দেয় রূপপুর প্রকল্পে।
পারমাণবিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২০০৯ সালে ঢাকায় এবং ২০১০ সালে মস্কোতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে কাঠামোগত চুক্তি সই হয়।
এরপর ২০১১ সালের ২ নভেম্বর ঢাকায় পারমাণবিক শক্তি কমিশন রোসাটমের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড়ায়।
এর আওতায় রোসাটম রূপপুরে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের দায়িত্ব পায়। চুক্তিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
সমঝোতা স্মারকে সই করেন তখনকার বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কমিশনের মহাপরিচালক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কিরিয়েংকো।
২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রকল্পের নকশা, প্রযুক্তি নির্বাচন এবং ব্যয় কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়। একই সময়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ঋণের মাধ্যমে প্রকল্প অর্থায়নের বিষয়টি নির্ধারিত হয়। চূড়ান্ত প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) থেকেও অনুমোদন পায়।
২০১৬ সালে রূপপুর এলাকায় শুরু হয় মূল নির্মাণকাজ। ২০১৭ সালে প্রথম ইউনিটে ‘ফার্স্ট কংক্রিট’ ঢালাইয়ের মাধ্যমে বাস্তব নির্মাণ পর্ব শুরু হয়। এটি এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
২০১৮ সালে দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ শুরু হয়। দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট করে নির্ধারণ করা হয়।
২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রকল্প এলাকায় রিঅ্যাক্টর ভবন, টারবাইন হল, কুলিং সিস্টেমসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়। একই সময়ে ভারী যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রযুক্তি সংযোজনের কাজ চলে।
২০২৩ সালে রাশিয়া থেকে প্রথম পারমাণবিক জ্বালানি (নিউক্লিয়ার ফুয়েল) দেশে আসে। ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। এরপর আসে আরও কয়েকটি চালান। বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে অক্টোবরে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হয় রূপপুরে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর পরই পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পায় রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র। ওই বছরের ৫ অক্টোবর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরএনপিপি) সনদ ও প্রতীকী জ্বালানি হস্তান্তর অনুষ্ঠান হয়। এতে ভার্চুয়ালি যোগ দেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়ার ‘ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল’ হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে ইউরেনিয়াম জ্বালানির যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ।
২০২৪ থেকে ২০২৫ সময়কালে ইউনিটগুলোতে কমিশনিং ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই কেন্দ্র থেকে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ যোগ হবে জাতীয় গ্রিডে। দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশ আসবে রুপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে।
রূপপুরের দুই ইউনিট পূর্ণমাত্রায় চালু হলে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাবে, যা ২ কোটি মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী ১৫ থেকে ২১ আগস্টের মধ্যে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। এরপর দুই মাসের মধ্যে এটি ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। আর ডিসেম্বরের শেষ বা ২০২৭ সালের জানুয়ারির শুরুতে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা করছে কর্তৃপক্ষ ।
রূপপুর প্রকল্পের ইতিহাস এক দীর্ঘ পথচলা। ছয় দশকের স্বপ্ন এখন বাস্তব। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সূচিত হয়েছে এক নতুন অধ্যায়।-কালের কষ্ঠ

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ